ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার |

মোবাইল ডাটা, মিনিট ও এসএমএস এখন আর বিলাসিতা নয়; এগুলো আধুনিক নাগরিক জীবনের অপরিহার্য ডিজিটাল সম্পদ এবং এগুলোর ব্যবহার এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত যাতে গ্রাহকের অর্থের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত হয়। একজন গ্রাহক যখন নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাটা বা মিনিট ক্রয় করেন, তখন সেটি ব্যবহার করার অধিকারও তারই থাকা উচিত

মোবাইল ডাটা ও কল মিনিট আজ একটি মৌলিক ডিজিটাল সেবা। কিন্তু এ সেবা নেয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় অভিযোগ মিলছে। গ্রাহকরা বলছেন, নির্দিষ্ট মেয়াদযুক্ত ডাটা, মিনিট ও এসএমএস প্যাকেজে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। একজন গ্রাহক নিজের অর্থ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাটা বা মিনিট কিনলেও সেটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহার করতে না পারলে অবশিষ্টাংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। অর্থাৎ গ্রাহক তাঁর ক্রয়কৃত সেবার পুরো সুবিধা ভোগ করতে পারেন না। অনেক সময় কর্মব্যস্ততা, অসুস্থতা, বিদ্যুৎ বা নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে কিংবা প্রয়োজন কম থাকার কারণে ডাটা অব্যবহৃত থেকে যায়। আবার অনেকে একাধিক সিম ব্যবহার করেন; ফলে একটি সিমের প্যাকেজ শেষ হওয়ার আগেই মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এতে গ্রাহক বাধ্য হয়ে নতুন প্যাকেজ কেনেন। অর্থাৎ এ প্রক্রিয়ায় গ্রাহক তাঁর প্রদত্ত অর্থের সমপরিমাণ সেবা পান না, বিপরীতে অপারেটররা বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত ডাটা ও মিনিটের আর্থিক সুবিধা হাতিয়ে নেয়। এটিকে ‘ডিজিটাল অপচয়’ বা ‘গোপন আর্থিক ক্ষতি’ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। যদিও মোবাইল অপারেটররা যুক্তি দেয় যে, প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণ, নেটওয়ার্ক পরিচালনা এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনার জন্য মেয়াদ প্রয়োজন, তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায়—গ্রাহক যখন অর্থের বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সেবা কিনেছেন, তখন সেই সেবার ব্যবহার কি শুধুমাত্র সময়সীমার কারণে বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত? ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে ভোক্তার অধিকার ও ন্যায্যতার প্রশ্নটি তাই নতুনভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

এ সমস্যার অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধরা যাক, একজন গ্রাহক ৩০ জিবি ডাটা কিনলেন, কিন্তু এক মাসে মাত্র ১৮ জিবি ব্যবহার করতে পারলেন। অবশিষ্ট ১২ জিবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেল। একই ঘটনা মিনিট ও এসএমএস প্যাকেজের ক্ষেত্রেও ঘটে। দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের ক্ষেত্রে এ ধরনের অব্যবহৃত ডাটা ও মিনিটের আর্থিক মূল্য বছরে বিশাল অঙ্কে পৌঁছে। এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের প্রতিটি টাকার হিসাব করে চলতে হয়। একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষার আগে বেশি ডাটা ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়, কিন্তু ছুটির সময় কম ব্যবহার করে। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরও প্রতিদিন একই পরিমাণ ডাটার প্রয়োজন হয় না। অথচ সবাইকে একই ধরনের নির্দিষ্ট মেয়াদের প্যাকেজ কিনতে হয়। অনেক সময় গ্রাহক শুধু অবশিষ্ট ডাটা বাঁচানোর জন্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভিডিও চালান বা ফাইল ডাউনলোড করেন, যা নেটওয়ার্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং প্রকৃত অর্থে ডিজিটাল সম্পদের অপচয় ঘটায়। অন্যদিকে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আবার নতুন প্যাকেজ কিনতে বাধ্য হওয়ার ফলে গ্রাহকের ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে এটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়, এটি ভোক্তা অধিকার, বাজারের স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন। বর্তমান সময়ে যখন সরকার ক্যাশলেস সমাজ, স্মার্ট বাংলাদেশ, ডিজিটাল শিক্ষা এবং ই-গভর্ন্যান্সের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন মোবাইল ডাটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন গ্রাহক যদি নিজের অর্থ দিয়ে একটি পণ্য বা সেবা ক্রয় করেন, তাহলে সেই সেবার ওপর তাঁর পূর্ণ অধিকার থাকা উচিত—এটি ভোক্তা অধিকারের একটি মৌলিক নীতি।

এ সমস্যা সমাধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ধরনের নীতি অনুসরণ করে, যেখান থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে। অনেক দেশে অপারেটররা ‘ডাটা রোলওভার’ বা অব্যবহৃত ডাটা পরবর্তী মাসে বহন করার সুবিধা দেয়। আবার কোথাও নির্দিষ্ট শর্তে অবশিষ্ট মিনিট ও ডাটাও পরবর্তী প্যাকেজে যোগ হয়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন একটি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে গ্রাহক নতুন প্যাকেজ কিনলে পূর্বের অব্যবহৃত ডাটা, মিনিট ও এসএমএস স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে। আরও উন্নত ব্যবস্থা হতে পারে ‘ডিজিটাল ওয়ালেট’ পদ্ধতি, যেখানে গ্রাহকের কেনা ডাটা একটি ডিজিটাল ব্যালেন্স হিসেবে জমা থাকবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে ব্যবহার হবে। বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে যেমন ক্রয়কৃত ইউনিট শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়, তেমনি মোবাইল ডাটাও নির্দিষ্ট মেয়াদ ছাড়া ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। এছাড়া বিটিআরসি অপারেটরদের জন্য একটি ন্যূনতম গ্রাহকবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। যেমন—সব ধরনের প্যাকেজে ডাটা রোলওভার বাধ্যতামূলক করা, অব্যবহৃত ব্যালেন্স সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রদর্শন, প্যাকেজ কেনার আগে স্পষ্টভাবে মেয়াদ ও শর্ত জানানো এবং গ্রাহকের সম্মতি ছাড়া স্বয়ংক্রিয় নবায়ন বন্ধ করা। একই সঙ্গে অপারেটরদের হিসাব ও বিলিং ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত নিরপেক্ষ অডিট হওয়া উচিত, যাতে গ্রাহক নিশ্চিত হতে পারেন যে প্রতিটি এমবি ও প্রতিটি মিনিট সঠিকভাবে হিসাব করা হচ্ছে। প্রযুক্তিগতভাবে এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা কঠিন নয়, কারণ বর্তমান ডিজিটাল বিলিং প্ল্যাটফর্মে প্রতিটি গ্রাহকের ব্যবহার ইতোমধ্যেই সেকেন্ড ও কিলোবাইট পর্যায়ে সংরক্ষিত হয়। তাই প্রয়োজন নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং গ্রাহকবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির সদিচ্ছা।

এসব বিবেচনায় ভবিষ্যতের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ, নমনীয় এবং গ্রাহককেন্দ্রিক হওয়া উচিত। যেমন, একজন গ্রাহক চাইলে টাকা দিয়ে সরাসরি ডাটা কিনবেন, যার কোনো মেয়াদ থাকবে না; আবার অন্য কেউ কম দামে সীমিত সময়ের অফারও নিতে পারবেন। অর্থাৎ একই সঙ্গে ‘মেয়াদযুক্ত ছাড়মূল্যের প্যাকেজ’ এবং ‘মেয়াদবিহীন পূর্ণমূল্যের ডাটা’ উভয় ধরনের বিকল্প রাখা যেতে পারে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় থাকবে, আবার গ্রাহক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। একইভাবে মিনিট, এসএমএস এবং আন্তর্জাতিক কল সুবিধার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হতে পারে। গ্রাহক চাইলে তাঁর ডাটা অন্য কাউকে শেয়ার/ট্রান্সফার করার সুযোগও রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি একটি স্বাধীন অনলাইন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা থাকা উচিত, যেখানে গ্রাহক সহজেই ডাটা কর্তন, মেয়াদ, বিলিং বা অন্য যেকোনো সমস্যার অভিযোগ করতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধান পাবেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিটিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সংগঠনগুলোকেও ডিজিটাল ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কারণ অধিকাংশ গ্রাহক এখনো প্যাকেজের সূক্ষ্ম শর্তাবলি পড়েন না বা বুঝতে পারেন না। স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, সহজ ভাষায় শর্ত ব্যাখ্যা এবং নিয়মিত জনসচেতনতামূলক প্রচারণা গ্রাহকদের আরও সচেতন করবে এবং অপারেটরদেরও অধিক জবাবদিহিমূলক আচরণে উৎসাহিত করবে।

মোবাইল ডাটা, মিনিট ও এসএমএস এখন আর বিলাসিতা নয়; এগুলো আধুনিক নাগরিক জীবনের অপরিহার্য ডিজিটাল সম্পদ এবং এগুলোর ব্যবহার এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত যাতে গ্রাহকের অর্থের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত হয়। একজন গ্রাহক যখন নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাটা বা মিনিট ক্রয় করেন, তখন সেটি ব্যবহার করার অধিকারও তারই থাকা উচিত। যুক্তিসংগত ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গ্রাহকের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করাও সমান জরুরি। সত্যিকার অর্থে দেশে একটি স্মার্ট ও ডিজিটাল রাষ্ট্র গড়তে টেলিযোগাযোগ খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ভোক্তাবান্ধব নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করা অত্যাবশ্যক। অব্যবহৃত ডাটা ও মিনিট পরবর্তী সময়ে বহনের সুযোগ, মেয়াদবিহীন ব্যবহারের বিকল্প, স্বচ্ছ বিলিং ব্যবস্থা, স্বাধীন তদারকি, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসংগতি ও অস্বচ্ছতা দূর হলে গ্রাহক ও অপারেটর উভয়েই দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে। উল্লেখ্য, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও বিভিন্ন গ্রাহক অধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী গ্রাহকদের এ দৃশ্যমান বা গোপনীয় ডিজিটাল আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা।

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়