নিজস্ব প্রতিবেদক
তিনটি বন্ডেড পোশাক প্রতিষ্ঠানের আমদানি-সংক্রান্ত অনিয়ম তদন্ত করতে গঠিত কাস্টমস তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধেই টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে। কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত কমিশনার আয়শা আক্তার, সদস্য অতিরিক্ত কমিশনার মাহবুবুর রহমান ভূঞা এবং সদস্য সচিব সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-মাসুমের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অর্থ দাবির অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লট, ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্তের সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অর্থ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। তবে কাস্টমসের তদন্ত প্রতিবেদনে এই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণের উল্লেখ নেই। ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পৃথক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।
কাস্টমস হাউস ঢাকার তদন্ত কমিটি ইউরেনাস অ্যাপারেলস (প্রা.) লিমিটেড, কুইক অ্যাপারেলস লিমিটেড এবং এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেডের আমদানি-সংক্রান্ত নথি যাচাই করে। তদন্তে তিন প্রতিষ্ঠানের মোট ৩ কোটি ৪৬ লাখ ৮৬ হাজার ৮৬৬ টাকা ৬৮ পয়সা শুল্ক-কর পরিশোধযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরেনাস অ্যাপারেলসের ৮৪টি বিলের বিপরীতে ১৯ হাজার ৪১৬ কেজি আমদানি করা ইনপুটের তথ্য বিজিএমইএর ইউডি ডাটায় পাওয়া যায়নি। এসব পণ্যের নির্ধারণযোগ্য মূল্য ১ কোটি ৪৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৭ টাকা ৭২ পয়সা এবং শুল্ক-কর ১ কোটি ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৮৪৯ টাকা ১৭ পয়সা।
এলিয়েন অ্যাপারেলসের ৮২টি বিলের বিপরীতে ৩১ হাজার ৮১৪ দশমিক ৮৫ কেজি পণ্যের তথ্য বিজিএমইএর ইউডিতে পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর নির্ধারণযোগ্য মূল্য ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার ৭৪৩ টাকা ৬৫ পয়সা এবং পরিশোধযোগ্য শুল্ক-কর ১ কোটি ৮০ লাখ ৫৬ হাজার ১২৬ টাকা ২২ পয়সা।
অন্যদিকে কুইক অ্যাপারেলসের ৯৭টি বিলের বিপরীতে ৯ হাজার ১০৫ কেজি পণ্যের তথ্য বিকেএমইএর ইউডিতে পাওয়া যায়নি। এর নির্ধারণযোগ্য মূল্য ৭৮ লাখ ৭০ হাজার ১২০ টাকা ৩৩ পয়সা এবং শুল্ক-কর ৫৪ লাখ ৯০ হাজার ৮৯১ টাকা ২৯ পয়সা।
তদন্ত কমিটি বলেছে, আমদানি-সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে ইউডি ডাটা যথাযথভাবে যাচাই করা হলে এসব অনিয়ম বা শুল্ক ফাঁকির সুযোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।
তদন্তকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে অভিযোগটির উৎস নিয়ে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এইচ এম ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. হুমায়ুন কবিরের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে একটি অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু হুমায়ুন কবির তদন্ত কমিটির কাছে দাবি করেন, তিনি ওই অভিযোগ করেননি।
তিনি আরও জানান, অভিযোগে যেসব কাস্টমস কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছিল, তাঁদের সঙ্গে তাঁর আগে পরিচয় বা কথা হয়নি এবং ২১ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁদের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়।
ফলে তদন্তের নথিতেই প্রশ্ন উঠেছে—হুমায়ুন কবিরের নামে অভিযোগটি যদি তিনি না করে থাকেন, তাহলে অভিযোগটি কে তৈরি বা দাখিল করেছিল? তাঁর নাম, পরিচয়পত্রের তথ্য ও স্বাক্ষর কীভাবে ব্যবহার করা হলো এবং এর পেছনে কার স্বার্থ ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রাথমিক অভিযোগে উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে তদন্ত কমিটি বলেছে, সংশ্লিষ্ট আমদানি চালান ছাড়ের সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব বা পদায়নের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তাঁদের স্বাক্ষর বা সংশ্লিষ্টতার কোনো নথিও কমিটি পায়নি।
তবে এর মধ্যেই তদন্ত কমিটির তিন সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তদন্ত প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ চাওয়া হয়েছিল।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হচ্ছে, কমিটির সভাপতি আয়শা আক্তার, সদস্য মাহবুবুর রহমান ভূঞা এবং সদস্য সচিব মোহাম্মদ আল-মাসুমের ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লট, ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদ রয়েছে। এমনকি তাঁদের সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকার কাছাকাছি বা তার বেশি বলেও দাবি করা হচ্ছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে কুইক অ্যাপারেলস লিমিটেডের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ৮ আগস্ট ২০২২ সাল থেকে ‘লকড’ বা ‘ডিপ সার্ভেইলেন্স’-এর আওতায় ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির এই অবস্থান বিবেচনায় নিলে অনিয়ম বা শুল্ক ফাঁকির সুযোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।
তদন্ত কমিটি এইচ এম ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ও এনএনকে কার্গো লিমিটেডের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
বিশেষ করে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার শুল্ক-কর পরিশোধযোগ্য দেখানো একটি তদন্তে কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ উঠলে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।