আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

হুতিদের টানা এক সপ্তাহের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও। মঙ্গলবার মক্কা ও জেদ্দাসহ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়।

ইতিহাসে এই প্রথম যুদ্ধের কারণে পবিত্র মক্কা শহরে এমন সতর্কতা জারি করা হলো। তবে সেখানে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে দ্রুতই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রতিনিধিরা হুতিদের কর্মকাণ্ডকে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির বিরুদ্ধে ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে ইরান-সমর্থিত হুতিরা একটি গতিশীল অভিযানের মাধ্যমে নতুন কিছু এলাকা ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাব-আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করছিল। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ইরাকভিত্তিক একটি ইরানপন্থী গোষ্ঠীর হামলার পর পাইপলাইনটি অচল হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ওই পাইপলাইনে আবার অপরিশোধিত তেল সরবরাহ শুরু হতে পারে।

এদিকে ইয়েমেনে চালানো বিমান হামলার জবাবে সৌদি আরবের একটি বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে হুতিরা। এতে ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।

হরমুজ প্রণালির পর বাব-আল-মানদেবও অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড গড়ে গ্যালনপ্রতি ৬ দশমিক ২৭ ডলারে পৌঁছেছে।

লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মিসরের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তাও চেয়েছেন। তবে ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে। সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও দ্বিধায় রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও আরও সংকটপূর্ণ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সাত মাসের যুদ্ধের মধ্যে ওই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় সীমিত হয়ে এসেছে। এর প্রভাব বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ওপরও পড়ছে।

সংঘাতের কারণে গত সপ্তাহ থেকেই তেলের দাম বাড়ছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ডিজেলের গড় খুচরা মূল্যও সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গ্যালনপ্রতি প্রায় ৬ দশমিক ২৭ ডলারে দাঁড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন সংকট
২০১৫ সাল থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে সৌদি আরব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধবিরতির কারণে সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছিল। তবে চলতি মাসে আবার লড়াই শুরু হয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের সমর্থক বাহিনীগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে থাকে হুতিরা।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র নতুন এক সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে। গত বছর দুই মাস ধরে হুতিদের ওপর বিমান হামলা চালানো দেশটির সামনে এখন দুটি বড় ঝুঁকি—বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নতুন হুমকি তৈরি হলেও সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা না করা, অথবা রিয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে আরেকটি ব্যয়বহুল যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়া।

এদিকে, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যকার সংঘাতের জেরে দেশটির জন্য ভ্রমণ সতর্কতা বা ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এই সতর্কবার্তায় মার্কিন নাগরিকদের সৌদি আরব ভ্রমণে পুনর্বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়ে লেভেল-৩ এ রাখা হয়েছে।

সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সৌদি আরবে মার্কিন স্বার্থকে লক্ষ্য করে ইরানি ড্রোন ও মিসাইল হামলার ঝুঁকি, সশস্ত্র সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক মাধ্যমের কার্যক্রম সংক্রান্ত স্থানীয় আইনগুলোর বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে।

সূত্র : রয়টার্স ও আল-জাজিরা।।