নিজস্ব প্রতিবেদক
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর কমিশনারের স্টাফ অফিসার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) চৌধুরী গোলাম হাসনাইনের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে সহযোগিতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাবেক কমিশনার আবু ওবায়দা ও অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের দায়িত্বকালে ওই চক্রের প্রভাব বিস্তার ঘটে এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। এমনকি মাসে কয়েক কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন সূত্রগুলো। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট আর্থিক নথি, লেনদেনের প্রমাণ বা তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। গোলাম হাসনাইনের বক্তব্য জানতে তাঁকে কল দেওয়া হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর নিজেই সম্পাদককে কল দিয়ে হুমকি দিয়ে বলেন, “আমরা সাত ভাই, আমাদের নামে কোনো সম্পত্তি নেই। আমার ওয়াইফ ভালো স্যালারির জব করে।” পরে দুর্ব্যবহার শুরু করে উত্তেজিত হয়ে বলেন, “তোর নামে মামলা করব, তুই কত বড় সাংবাদিক দেখছি আমি, বস্তির টোকাই তোরা।”

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, বন্ড সুবিধার ব্যবহার এবং রাজস্ব সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কমিশনারের স্টাফ অফিসার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) চৌধুরী গোলাম হাসনাইনের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, অনিয়মের মাধ্যমে সুবিধা দেওয়া এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক কমিশনার আবু ওবায়দা ও অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের সময় ওই চক্রের প্রভাব বিস্তার ঘটে। প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট আর্থিক নথি, লেনদেনের প্রমাণ কিংবা তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি।

বন্ড সুবিধা ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে যোগদানের পর থেকে চৌধুরী গোলাম হাসনাইনকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে ওঠে। ওই বলয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম এবং আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সূত্রগুলোর ভাষ্য, সদ্য বিদায়ী কমিশনার আবু ওবায়দা ও অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের দায়িত্বকালে এই বলয় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। তবে কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে কার ভূমিকা ছিল, কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে কিংবা কোন নথির মাধ্যমে অনিয়ম ঘটানো হয়েছে—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্যের ব্যবহার ও বাজারজাতকরণ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, অবৈধ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার প্রমাণিত হলে তা শুল্ক-কর ফাঁকি এবং সরকারি রাজস্বের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নাম, চালান নম্বর, শুল্ক নির্ধারণের নথি কিংবা রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত সিন্ডিকেটে কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সিপাহির সম্পৃক্ততা রয়েছে। সদ্য বিদায়ী অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেন ওই চক্রকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বলেও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে নয়, বরং তাঁর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। কমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) মজনু মিয়াসহ আরও কয়েকজনের নামও অভিযোগের সূত্রে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ, তাঁদের দায়িত্বের সঙ্গে কথিত অনিয়মের সম্পর্ক কিংবা অভিযোগের সমর্থনে কোনো নথি প্রকাশ করা হয়নি।

সূত্রগুলোর দাবি, হাসনাইন এর আগে যেসব কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোর নাম, অভিযোগের প্রকৃতি, বিভাগীয় তদন্তের ফল কিংবা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নথি পাওয়া যায়নি। ফলে অতীতের অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমান অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। অভিযোগগুলো যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের দাপ্তরিক নথি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের লেনদেন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সাংবাদিকদের বাধা ও হুমকির অভিযোগ
উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বাধা ও হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগও উঠেছে। একাধিক সংবাদকর্মীর দাবি, কার্যালয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য গেলে তাঁদের প্রবেশপথের গেটে আটকে দেওয়া হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও তাঁরা কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

কয়েকজন সংবাদকর্মীর ভাষ্য, তাঁদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য একটি কথিত ‘লাঠিয়াল বাহিনী’র মাধ্যমে হুমকি ও লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব ঘটনার তারিখ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ কিংবা লিখিত অভিযোগের অনুলিপি পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই জরুরি। এ বিষয়ে নতুন কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল হলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং গেটের প্রবেশসংক্রান্ত নথি বা নিরাপত্তাকর্মীদের বিবরণ যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সম্পদের উৎস ও তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীদের দাবি, ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের চাকরিজীবনে চৌধুরী গোলাম হাসনাইন বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে রয়েছে বলেও কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন। তবে তাঁর সম্পদের পরিমাণ, বৈধ আয়, সম্পদ বিবরণী কিংবা দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান বা তদন্ত শুরুর বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথিভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন।

নতুন কমিশনারের ভূমিকা নিয়ে প্রত্যাশা
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, নতুন কমিশনার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে আনুষ্ঠানিক তদন্তের উদ্যোগ নেবেন। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, শুল্ক-কর ফাঁকি কিংবা ঘুষ লেনদেনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধি অনুসরণের বিষয়টিও পরিষ্কার করা জরুরি।

তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। আর্থিক নথি, আমদানি-রপ্তানির তথ্য, দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ সম্ভব। অভিযোগগুলো তদন্তের আওতায় এলে বন্ড ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সরকারি রাজস্ব সুরক্ষার বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়ন করা যাবে।

অভিযোগের আরও একটি অংশে বলা হয়েছে, বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট সদস্যের সঙ্গে ওই কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো নথি বা নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্রগুলো বলছে, হাসনাইন এর আগে যেসব কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল।

উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটেও একই ধরনের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সিন্ডিকেটে কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সিপাহিও যুক্ত রয়েছেন। সদ্য বিদায়ী অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেন তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ ছাড়া কমিশনারের পিএ মজনু মিয়াসহ আরও কয়েকজনের নামও অভিযোগের সঙ্গে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। হাসনাইন চক্রের বিরুদ্ধে নিজেদের কর্মকাণ্ডের সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদের বাধা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একাধিক সংবাদকর্মীর দাবি, উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কার্যালয়ে সংবাদ সংগ্রহের জন্য গেলে গেটে তাঁদের আটকে দেওয়া হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন সংবাদকর্মী দাবি করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য একটি কথিত ‘লাঠিয়াল বাহিনী’র মাধ্যমে হুমকি ও লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে।

এ বিষয়ে নতুন কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে হাসনাইন অল্প সময়ের চাকরিজীবনে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে রয়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তবে তাঁর সম্পদের উৎস, আয়-ব্যয়ের হিসাব কিংবা দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্তের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে চৌধুরী গোলাম হাসনাইনের বক্তব্য জানতে তাঁকে কল দেওয়া হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর নিজেই সম্পাদককে কল দিয়ে হুমকি দিয়ে বলেন, “আমরা সাত ভাই, আমাদের নামে কোনো সম্পত্তি নেই। আমার ওয়াইফ ভালো স্যালারির জব করে।” পরে দুর্ব্যবহার শুরু করে উত্তেজিত হয়ে বলেন, “তোর নামে মামলা করব, তুই কত বড় সাংবাদিক দেখছি আমি, বস্তির টোকাই তোরা।” সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে ওঠা এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে বন্ড ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ও সুরক্ষিত হবে।