মোঃসাগর ,বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি:

পরিবেশের ভারসাম্য সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় সারা দেশে আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক যুগান্তকারী ও দূরদর্শী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। তবে পার্বত্য বান্দরবানের লামা বন বিভাগে এক শ্রেণির দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসদাচরণ, অনিয়ম ও কাঠ পাচারকারী চক্রের সক্রিয়তার কারণে সরকারের এই প্রশংসনীয় উদ্যোগ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, লামা বন বিভাগের ডলুছড়ি রেঞ্জাধীন সরই সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবাধে নিধন ও পাচার করা হচ্ছে প্রাকৃতিক গর্জন গাছ । ডলুছড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা (রেঞ্জার) এ কে এম আলতাফ হোসেন এবং সরই বিট কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের প্রত্যক্ষ যোগ সাজশে কতিপয় অসাধু কাঠ ব্যবসায়ীর অনৈতিক বাণিজ্যের কারণে সরকারি বন ভূমি দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলে পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং ক্ষুণ্ন হচ্ছে সরকারের ভাবমূর্তি।
সম্প্রতি সরই ইউনিয়নের আমতলী সংরক্ষিত বনভূমিতে সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে পরিবেশ বিনাশের এক আশঙ্কা জনক চিত্র পরিলক্ষিত হয়। বনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন স্থানে নিধনকৃত অর্ধশতাধিক গর্জন গাছের মোথা (গোড়া) পড়ে থাকতে দেখা যায়। গহীন অরণ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কেটে রাখা বিপুল পরিমাণ বিশাল আকৃতির কাঠের গুঁড়ি। বাস্তুসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব ‘মাদার ট্রি’ অবৈধভাবে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার কারবার পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, লামা অঞ্চল থেকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধ কাঠ পরিবহনের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ডলুছড়ি রেঞ্জ এলাকা। এই চক্রের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে অভিযুক্ত এ কে এম আলতাফ । বন বিভাগের বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী—জোত পারমিটের আওতায় কাঠ লোড করার সময় সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তার সরেজমিনে উপস্থিত থেকে সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম অনুসরণের কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না।
অভিযোগ রয়েছে, ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম আলতাফ হোসেন দফতরে বসেই পারমিটপ্রতি নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। এর সুবাদে গভীর রাতে বে আইনিভাবে ট্রাকে কাঠ লোড করা হয়। পরদিন সকালে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পরিবহন পারমিটে (টিপি) স্বাক্ষর করে উক্ত অবৈধ কাঠকে বৈধতা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এসব চোরাই কাঠের চালান লামার ফাইতং, আজিজনগর ও সরই সড়ক দিয়ে অবাধে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায়।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একদিকে বর্তমান সরকার পরিবেশ রক্ষা ও সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে শত কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে; অন্যদিকে বন বিভাগের দায়িত্বে থাকা রক্ষকদের একাংশের পরোক্ষ মদদে ধ্বংস হচ্ছে শতাব্দীর প্রাচীন বনাঞ্চল। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের রাজস্ব ফাঁকি ও অসদাচরণের কারণে সরকারের জনকল্যাণমুখী ভাবমূর্তি চরম প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
বনাঞ্চল রক্ষা ও সরকারি রাজস্ব ক্ষতি রোধে ডলুছড়ি ও সরই এলাকার বাসিন্দা এবং পরিবেশপ্রেমী নাগরিকরা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা অবিলম্বে রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম আলতাফ হোসেন এবং বিরুদ্ধে বিভাগীয় উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে কোনো অশুভ চক্রান্তের অংশ হিসেবে সরকারি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মসূচি নস্যাতে তারা লিপ্ত রয়েছে কিনা—তাও খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীরা।
এলাকাবাসীর মতে, বনভূমির এই অসাধু চক্রকে দ্রুত অপসারণ ও আইনের আওতায় আনা না হলে পার্বত্য বান্দরবানের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক বনাঞ্চল অচিরেই বিলুপ্তির পথে ধাবিত হবে।