ম. ম. রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট

সুন্দরবন, মোংলা বন্দর, নৌঘাঁটি ও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন শেষে মোংলা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সফরকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। তাদের আশা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, ড্রেজিং, প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে এ অঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেল ৫টার দিকে মোংলা হেলিপ্যাড থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে সকালে হেলিকপ্টারে সুন্দরবন পরিদর্শন শেষে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন তিনি। পরে নৌপথে বানৌজা মোংলায় পৌঁছে নৌবাহিনী, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল্লাহ হারুন, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফাসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভা ও মধ্যাহ্নভোজ শেষে বিকেলে মোংলা বন্দরের জেটি পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্ধারিত স্থান ঘুরে দেখেন তিনি।

পথে সড়কের পাশে অপেক্ষায় থাকা নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। তাকে কাছ থেকে দেখতে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন অনেকে।

স্থানীয় বাসিন্দা কালাম শেখ বলেন, ‘গাড়ি থেকে নেমেই প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। ভিড়ের মধ্যে আরও একবার হাত মেলানোর সুযোগ পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাত মেলানোর এমন সুযোগ জীবনে হয়তো আর আসবে না। আমি অনেক খুশি।’

রবিউল ইসলাম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘একজন প্রধানমন্ত্রী এত সাদাসিধে জীবনযাপন করতে পারেন, তা তারেক রহমানকে না দেখলে বুঝতাম না। নিজে গাড়ি থেকে নেমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। আমরা খুব খুশি হয়েছি। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সার্থক হয়েছে।’

বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নৌপথের নাব্যতা রক্ষা এবং নতুন শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়বে। একই সঙ্গে তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান।

ব্যবসায়ী ফিরোজ আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে তারা উন্নয়নের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। চীনের সঙ্গে মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন নিয়ে হওয়া চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের কার্যক্রম বাড়বে এবং এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরবে বলে আশা করেন তিনি।

ব্যবসায়ী হেমায়েত উদ্দিন বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে মোংলায় বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনাল চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিএনপি নেতা হাফিজুর রহমান তুহিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের জেটি, সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্ট এলাকায় প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করেছেন। তার আশা, অসম্পূর্ণ জেটি নির্মাণ ও ড্রেজিংসহ থমকে থাকা প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ হবে। প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়বে।

মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকার আলী বলেন, মোংলা বন্দরের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মিত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়বে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করেন তিনি।

মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি করা রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক বলেন, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি থেকে মোংলা বন্দরে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে বারভিডা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বৈষম্য নিরসনে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন ব্যবসায়ী এই নেতা।

বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা বাড়াতে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে আশা করেন তিনি।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় কাজ হারানো মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও এসব উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যেও ইতিবাচক প্রত্যাশা দেখা গেছে। তাকে স্বাগত জানিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে মিছিল করে মোংলা উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতাকর্মীরা।

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পরিদর্শনস্থলগুলোতে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর), নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দর সফর করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সফরে পরিদর্শন করা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চ