লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান নতুন করে আরও জোরদার করায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দুই শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে ইসরায়েলি সেনাসদস্যদের লেবাননের আরও ভেতরে অগ্রসর হওয়ার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেওয়ার পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সরবরাহ নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সোমবার (১ জুন) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সে প্রকাশিত এক বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদন থেকে বিশ্ববাজারে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে আজ যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল বা ‘ডব্লিউটিআই’ ফিউচারের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ৩৭ ডলার বা ২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ৮৯ দশমিক ৭৩ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ২ দশমিক ১৬ ডলার বা ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৩ দশমিক ২৮ ডলারে উঠে গেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে ইসরায়েল-লেবানন শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও পরবর্তীতে আবার নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা তেলের বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ ঝুঁকির আশঙ্কাকে উস্কে দিয়েছে।

বৈশ্বিক সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতকে ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক বিস্তার হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইরানের সরাসরি সমর্থনে ইসরায়েলের দিকে রকেট ও ড্রোন হামলা শুরু করলে এই ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা হয়। পরবর্তীতে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে উভয় পক্ষ একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও সীমান্তে মাঝেমধ্যেই গোলাগুলি ও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ ‘হরমুজ প্রণালি’তে পেতে রাখা মাইন নিয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বখ্যাত বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর এক বিশেষ নোটে বলেন, এই সংবেদনশীল প্রণালিটি পুরোপুরি নিরাপদ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় চালু করতে বেশ কিছুটা সময় লাগতে পারে এবং তেলের বাজারে সহজে স্বস্তি ফিরতেও দেরি হতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন কোনো চুক্তি সম্পন্ন হলেও বাজারে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ তেলের সরবরাহ রাতারাতি বৃদ্ধি পাবে না।’

অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ বাণিজ্যই মূলত এই কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়ে থাকে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের জেরে ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথটি বন্ধ করে রেখেছে।

অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীনের কারখানা খাতের সামগ্রিক কার্যক্রম বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। রপ্তানি হ্রাস ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির গতি সাময়িকভাবে কমে আসছে বলে আশঙ্কা তৈরি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকটের তীব্র উদ্বেগ অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাকে পুরোপুরি ছাপিয়ে গেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স