ইকবাল বাহার, কানাইঘাট প্রতিনিধি:

সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বড়চাতল এলাকার ভূগর্ভে তেল ও গ্যাসের অস্তিত্ব নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা, কৌতূহল ও জনশ্রুতি প্রচলিত ছিল। প্রায় ৪৪ বছর পর জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রকাশিত সরকারি তথ্য সেই দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সরকারি নথিপত্রে বড়চাতল এলাকায় তেল ও গ্যাসের উপস্থিতির তথ্য উঠে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসান বড়চাতল এলাকায় আবিষ্কৃত ঐতিহাসিক তেলক্ষেত্রটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। তিনি প্রশ্নে উল্লেখ করেন, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বড়চাতল এলাকায় একটি তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল বলে জানা যায়। বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সেখান থেকে পুনরায় তেল ও গ্যাস উত্তোলনের কোনো পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কি না, তা জানতে চান তিনি।

সংসদে দেওয়া লিখিত জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, জার্মান সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত মাল্টিওয়েল ড্রিলিং প্রজেক্ট (এমডিপি)-এর আওতায় বড়চাতল এলাকায় ‘আটগ্রাম-১’ নামে একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছিল। পেট্রোবাংলা ১৯৮১ সালের ২৫ জুন কূপটির খননকাজ শুরু করে এবং ১৯৮২ সালের ১০ জুন তা সম্পন্ন করে। কূপটির চূড়ান্ত গভীরতা ছিল ১৬ হাজার ২৭৬ ফুট বা প্রায় ৪ হাজার ৯৬১ মিটার।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, খননকাজের সময় ভূগর্ভে ছয়টি সম্ভাবনাময় রিজার্ভার স্যান্ড জোন শনাক্ত করা হয় এবং সেগুলোতে পরীক্ষা চালানো হয়। পরীক্ষায় প্রতিটি স্তরেই প্রাকৃতিক গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। কূপ থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ০.১৫৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ১ হাজার ২৩৪ ব্যারেল তরল উপাদান বা পানি প্রবাহিত হয়েছিল।

তবে প্রাথমিকভাবে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে কূপটির ‘ফ্লোয়িং ওয়েলহেড প্রেসার’ দ্রুত কমে যায়। একপর্যায়ে চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসায় গ্যাস ও তেলের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। পেট্রোবাংলার ওয়েল কমপ্লিশন রিপোর্টে কূপটিকে অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তৎকালীন বাজার পরিস্থিতি, সীমিত উৎপাদন এবং উচ্চ উত্তোলন ব্যয়ের কারণে ১৯৮২ সালে কূপটিকে ‘প্লাগড অ্যান্ড অ্যাব্যান্ডনড’ ঘোষণা করা হয়।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্যমতে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আগ্রহ ও উদ্যোগে বড়চাতল এলাকায় এই অনুসন্ধান কার্যক্রম গতি লাভ করে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এলাকায় একটি হেলিপ্যাডসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, সেই সময়কার কিছু নিদর্শন এখনও এলাকায় বিদ্যমান রয়েছে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আশির দশকের প্রযুক্তি ও বর্তমান সময়ের প্রযুক্তির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে উন্নত ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সিসমিক জরিপ, অনুভূমিক খনন এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিত্যক্ত ক্ষেত্র থেকেও নতুন করে তেল ও গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে বড়চাতল এলাকার সম্ভাবনাও আধুনিক প্রযুক্তির আলোকে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।

সচেতন মহলের অভিমত, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বড়চাতল এলাকায় নতুন করে ভূতাত্ত্বিক ও সিসমিক জরিপ পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স অথবা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় আধুনিক জরিপ পরিচালিত হলে এ অঞ্চলের প্রকৃত সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের মতে, জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বড়চাতল তেলক্ষেত্র আবারও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পেয়েছে। চার দশক ধরে লোকমুখে প্রচলিত যে তথ্যকে অনেকে কেবল জনশ্রুতি বলে মনে করতেন, সরকারি তথ্য প্রকাশের ফলে সেটি এখন দেশের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।