গাইবান্ধা থেকে মোঃ আবু জাফর মন্ডলঃ

উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় টানা কয়েকদিনের তীব্র দাবদাহ ও ভ্যাপসা গরমে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অসহনীয় তাপমাত্রা, বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে দিন পার করছেন।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই সূর্যের প্রখর তাপ অনুভূত হচ্ছে। দুপুর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। প্রচণ্ড রোদ ও ভ্যাপসা গরমের কারণে দুপুরের পর রাস্তাঘাট, হাটবাজার এবং জনসমাগমস্থলগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে চাইছেন না।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খোলা আকাশের নিচে কাজ করা দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশা-অটোরিকশা চালক, কৃষি শ্রমিক ও পথচারীরা। জীবিকার তাগিদে কাজ চালিয়ে যেতে হলেও অতিরিক্ত গরমে তাদের কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অনেকেই হিটস্ট্রোক, মাথা ঘোরা ও শারীরিক দুর্বলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে গরমজনিত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসা সূত্রে জানা যায়, শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ডায়রিয়া, জ্বর, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট, হিটস্ট্রোকসহ নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা বাড়ছে।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বের হয়ে যাওয়ায় পানিশূন্যতা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন।
অভিভাবকরা জানিয়েছেন, তীব্র গরমের কারণে শিশুদের স্বাভাবিক খেলাধুলা ও পড়াশোনায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ফ্যান কিংবা শীতল পরিবেশের অভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা অস্বস্তিতে ভুগছে। ফলে অনেক শিশু জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে বয়স্কদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগজনিত জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
জেলার বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঠান্ডা পানীয়, ডাবের পানি, শরবত ও বিশুদ্ধ পানির চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। তবে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত তরল খাবার ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে বাইরে বের না হতে, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করতে, ওরস্যালাইন ও তরল খাবার গ্রহণ করতে এবং শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে। এছাড়া যারা দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করছেন তাদের নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রাম করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত বৃষ্টিপাত না হলে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে এবং এই ভ্যাপসা গরমের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই আকাশে মেঘের দেখা ও বৃষ্টির আশায় প্রহর গুনছেন গাইবান্ধা ও আশপাশের এলাকার মানুষ।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, চলমান তীব্র গরমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করা, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।