আইন-আদালত

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম, খুন ও গণহত্যার অন্তত ১০টি মামলার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ও ইন্টারপোলের মাধ্যমে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও শুরু করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার, তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা, ধরন এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আবদুল কাইয়ুম এবং সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলামও এই আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তার (বেনজীর) বিরুদ্ধে আমাদের এখানে প্রায় ১০টির মতো মামলা, আমরা কিন্তু ইনভেস্টিগেশন করে যাচ্ছি এবং প্রত্যেকটার সাথে তার কানেকশন আছে। তিনি যখন র‌্যাবের প্রধান ছিলেন, তখন গুমের সাথে যেগুলো (মামলা) অলরেডি চলমান আছে, তার মধ্যে বিচার চলছে।’

বেনজীরকে শাপলা চত্বরের ঘটনার ‘অন্যতম কুশীলব’ হিসেবে বর্ণনা করে আমিনুল বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে আমাদের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। চট্টগ্রামের একরাম কমিশনার হত্যাকাণ্ড, তার সাথেও তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল, সেখানেও তিনি আছেন। এবং আরও অন্তত ৭ থেকে ১০টি মামলার তদন্ত চলমান আছে, যেগুলোর প্রত্যেকটার মধ্যে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে।’

বেনজীর ‘অসংখ্য হত্যাকাণ্ডে’ জড়িত ছিলেন দাবি করে আমিনুল বলেন, ‘তিনি র‍্যাবের প্রধান হিসেবে অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত, তিনি যখন পুলিশের প্রধান ছিলেন, আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, অসংখ্য অপরাধের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন।’

সাবেক এই আইজিপিকে ফিরিয়ে আনতে ট্রাইব্যুনালের ওয়ারেন্টের কপি ইতোমধ্যে পুলিশের বিশেষ শাখা এনসিবিতে পাঠানো হয়েছে বলে মো. আমিনুল ইসলাম জানান।

তিনি বলেন, ‘আমরা চিঠি দেব। ইতোমধ্যে আমরা সরকারের কাছে আমাদের ওয়ারেন্টগুলোর কপি দিয়ে দিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের সরকারের যে পুলিশের একটা সংস্থা আছে, যার মাধ্যমে রেড নোটিস বা কালার কোডের নোটিস পাঠানো হয়, আমরা অলরেডি আমাদের ওয়ারেন্টের কপি তাদেরকে দিয়ে দিয়েছি। আমরা চিঠিটা পাঠাব আমাদের তদন্ত সংস্থা থেকে এনসিবিকে, ওখান থেকে ওটা যাবে সংশ্লিষ্ট ইন্টারপোলে।’

২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন বেনজীর। তার আগে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন র‌্যাবের মহাপরিচালক। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান।

তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আগে থেকেই লোকমুখে আলোচনা ছিল। তবে ২০২৪ সালের মার্চে সংবাদপত্রে তার সম্পদ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত।

এরপর বেনজীর ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি দুর্নীতির মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিচার বহির্ভূত হত্যা, গুম, খুনে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়েও তদন্ত চলছে।

এতসব অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা সাবেক এই পুলিশ প্রধানকে ধরতে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারি করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার জাতীয় সংসদে জানান, সেই রেড নোটিসের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে।

দুবাইয়ের এনসিবির সঙ্গে সমন্বয় করে ‘অতি দ্রুতই’ তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানান মন্ত্রী।

সোমবার ট্রাইব্যুনালের সংবাদ সম্মেলনে সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলাম এনসিবির কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “রেড নোটিস তো আসলে ইন্টারপোলের একটা ফাংশন। আমাদের এখানে একটা ব্যুরো আছে, এটাকে বলে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো, এনসিবি। এটা চালায় আমাদের পুলিশের লোকেরাই, বাংলাদেশ পুলিশের লোকেরাই। কিন্তু কমুনিকেশনগুলা হয় সব ইন্টারপোলের সাথে। তো এখান থেকেই আমরা আসলে রেড নোটিসের আবেদনগুলো পাঠাই ইন্টারপোলের হেডকোয়ার্টারে।

‘ইন্টারপোলের কাজ শেষ। এরপর ওইটার প্রেক্ষিতে আরব আমিরাতের ইন্টারপোলের যে শাখা, তারা ওখানকার লোকাল পুলিশ, মানে দুবাই পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করেছে। এর আগেও তো আরব আমিরাত থেকে খুনের মামলার আসামি এল। ওখানকার পুলিশ তারা অ্যারেস্ট করেছে, আমাদেরকে জানিয়েছে। আমাদের ওখান থেকে সিআইডি থেকে পুলিশ অফিসার গিয়ে বাংলাদেশের তাকে নিয়ে আসছে।’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকলেও কূটনৈতিক চ্যানেলে তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব জানিয়ে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যে কয়টি ওয়ারেন্ট আছে, সেগুলো দিয়ে সরকার ইতোমধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে ইউএই সরকারের কাছে আবেদন করেছে, তাকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার জন্য। এবং ওখানকার একটা প্রসিডিউর আছে যে তাদের ৩০ দিনের মধ্যে আমরা যখন কোনো এক্সট্রাডিশনের আবেদন করা হয়, সেখানকার প্রসিকিউটরের কাছে সেটা উপস্থাপন করা হয়, প্রসিকিউটর এটা আপিল আকারে তাদের আদালতে উপস্থাপন করে, আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে সেই বন্দিকে ফেরত পাঠানো হয়।’

চুক্তি না থাকার বিষয়ে সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এক্সট্রাডিশন চুক্তি আরব আমিরাতের সঙ্গে নাই। ভারতের ও থাইল্যান্ডের সাথে আছে। কিন্তু ওটা যে থাকতেই হবে, নট নেসেসারি। ওইটা থাকলে ইজি হইত। কিন্তু দুই দেশের গভর্নমেন্ট পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমেই তাকে নিয়ে আসতে পারে।’

বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর ট্রাইব্যুনালে হাজির ও রিমান্ডের প্রস্তুতি রয়েছে জানিয়ে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তাকে যদি বাংলাদেশে আনা হয়, আমাদের এই ট্রাইব্যুনালেও তাকে আনা হবে। যেগুলোতে বিচার চলছে সেখানে হাজির করা হবে, যেগুলো তদন্তাধীন আছে সেগুলোতেও তাকে রিমান্ডে নেওয়া হবে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এবং ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ কঠোর হস্তে এই বিচারটি সম্পন্ন করবে।’