বিশেষ প্রতিনিধি |
পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন, বুকভরা আশা আর ভাগ্য পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এই তিনটিই প্রতি বছর হাজারো বাংলাদেশি তরুণকে বিদেশমুখী করে। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ গরু-ছাগল বা গয়না বন্ধক রাখেন, আবার কেউ উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে পাড়ি জমান অচেনা দেশে।
কিন্তু সবার ভাগ্যে সাফল্য জোটে না। কেউ ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে প্রাণ হারান, কেউ বিদেশের কারাগারে বন্দি হন, আবার কেউ মানবপাচারকারী ও প্রতারক চক্রের হাতে পড়ে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। বহু স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়া এসব মানুষের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে, ভাঙা স্বপ্ন আর তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

এমনই এক করুণ বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে কম্বোডিয়ার সাইবার প্রতারণা চক্রের নিয়ন্ত্রিত স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার হওয়া আরও ১০৯ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। মঙ্গলবার রাতে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এর মধ্য দিয়ে জুন মাসে কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮৩ জনে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত চার দিনে কম্বোডিয়া থেকে মোট ৩৬২ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। বিমানবন্দরে তাদের সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে জরুরি সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

ফিরে আসা কয়েকজন জানান, উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার কর্মীসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। একজন ভুক্তভোগী জানান, একটি রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্রের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় যেতে তিনি ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করেন এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে ছাড়পত্রও নেন।

কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর বৈধ চাকরির পরিবর্তে তাকে একটি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে অনলাইন প্রতারণায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, সাইবার স্ক্যাম এখন মানবপাচারের নতুন ও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। যারা এতে রাজি হন না, তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন।

তিনি বলেন, জুন মাসে ৫৮৩ জনের দেশে ফেরা প্রমাণ করে কত বড় পরিসরে বাংলাদেশিরা এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি ও আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে কাজের উদ্দেশ্যে ১৫ হাজার ৯২১ বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গেছেন। তবে ফিরে আসা ব্যক্তিদের দাবি, প্রতারণার শিকার হয়ে বা কাজ না পেয়ে এখনও কয়েক হাজার বাংলাদেশি সেখানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, ভিসার ধরন এবং সরকারি অনুমোদন ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ ভাগ্য বদলের আশায় ঘর ছাড়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু অর্থ নয়, কেড়ে নিতে পারে মানুষের স্বপ্ন, সম্মান, এমনকি জীবনও।