নিজস্ব প্রতিবেদক:
এসএসসি পাসের পর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি না হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হরে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
তিনি বলেন, আগে এসএসসির পর সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত। কিন্তু এবার মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ, কারিগরি শিক্ষায় ৫৪ শতাংশ এবং সাধারণ শিক্ষায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং আমাদের জন্য বড় প্রশ্ন।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে কিছু কারণ সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবার অনেক শিক্ষার্থী ফরম পূরণই করেনি। সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে সেটি সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আর না ঘটে। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমাদের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আপনাদের প্রতিবেদন আমরা গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করি এবং সেগুলোর ভিত্তিতেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পদোন্নতি কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার পথ খুলে দিয়েছে আপিল বিভাগের রায়। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) এ সংক্রান্ত একটি মামলায় রাষ্ট্রের করা আপিল মঞ্জুর করে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মামলাটি সরকারের পক্ষে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার অবসান হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন গতি ফিরবে এবং একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের অন্যান্য শূন্য পদ পূরণেও দ্রুত অগ্রগতি হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন বলেন, আদালতের রায়ের ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি ও নিয়োগ-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা দূর হয়েছে। এখন দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও জানান, আপিল বিভাগের রায়ের ফলে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম পুনরায় চালু করা যাবে। প্রধান শিক্ষক পদে বদলি কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ জন সহকারী শিক্ষক পদোন্নতির সুযোগ পাবেন। পদোন্নতির ফলে সৃষ্ট শূন্য পদে নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে। বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি ফিরবে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে শিক্ষক সমাজে কর্মোদ্দীপনা বাড়বে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ২০১৭ সালে জাতীয়করণ হওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৬৩ জন শিক্ষক হাইকোর্টে রিট করেন। তারা ২০১৩ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী কার্যকর চাকরিকালের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ, প্রধান শিক্ষক হিসেবে বেতন-স্কেল এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও আর্থিক সুবিধা দাবি করেন। পরে হাইকোর্ট আংশিকভাবে রুল অ্যাবসোলিউট করে নিয়োগবিধির একটি বিধানকে বেআইনি ঘোষণা করেন। সরকারের পক্ষ থেকে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্ট্যাটাস কো বজায় রাখার নির্দেশ দেন। এর ফলে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি জানান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদের ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং ৮০ শতাংশ সহকারী শিক্ষক থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০টি প্রধান শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় বিদ্যালয় পরিচালনা, পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে দায়িত্ব চালাতে হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আদালতের রায়ের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা কীভাবে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করেছি। তিনি জানিয়েছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে রিকুইজিশন পেলেই আইনগতভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবকে প্রয়োজনীয় রিকুইজিশন দ্রুত প্রস্তুত করে পিএসসিতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, ‘শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও প্রায় চার হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়েও আরও প্রায় চার হাজার শিক্ষক প্রয়োজন। এই সংকট সাম্প্রতিক সময়ের নয়, দীর্ঘদিনের। আমরা দ্রুত এসব শূন্যপদ পূরণে কাজ করছি।
বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদেরই প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শিক্ষার মান উন্নয়নই প্রধান লক্ষ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া এবং কিন্ডারগার্টেনমুখী হওয়ার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘‘আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়ানো। আনন্দময় শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, নৈতিক শিক্ষা ও বিতর্কচর্চাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।