মোঃ আব্দুল রহমান
২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের মাস। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ধীরে ধীরে যে গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছিল, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ৫ জুলাই।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও এদিন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি প্রমাণ করে যে আন্দোলনটি আর কোনো একক ক্যাম্পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা জাতীয় পর্যায়ের ছাত্রজাগরণে পরিণত হতে শুরু করেছে।

 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলা এসব কর্মসূচিতে হাজারো শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ আন্দোলনের প্রতি তাদের দৃঢ় অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যায়।

শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না।

দিনব্যাপী কর্মসূচির পর আন্দোলনের সমন্বয়করা আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তারা ৭ জুলাই থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের আহ্বান জানান। এই ঘোষণা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও ব্যাপক সাড়া সৃষ্টি করে।

৫ জুলাইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা। আন্দোলনের গতি থামিয়ে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে আন্দোলনের সমন্বয়কদের বের করে দেওয়ার ঘোষণা দেয় ছাত্রলীগ।

বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রাত গভীর পর্যন্ত বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও স্লোগানে ক্যাম্পাস প্রকম্পিত করে রাখেন। এতে আন্দোলনের প্রতি শিক্ষার্থীদের সংহতি আরও সুদৃঢ় হয়ে ওঠে।

 

এই দিনে আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’। সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান খান এবং অধ্যাপক আবদুস সালাম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে ২০১৮ সালে জারি করা কোটা বাতিলের সরকারি পরিপত্রের অংশবিশেষ অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

আরও পড়ুন: নতুন নীতিতে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা-দক্ষতা বাড়বে: রাষ্ট্রপতি
একইসঙ্গে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানানো হয়। শিক্ষকদের এই অবস্থান আন্দোলনকারীদের নৈতিক শক্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, রাজধানীর সাত কলেজ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ সমাবেশ ও সড়ক অবরোধে অংশ নেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ৫ জুলাই ছিল সেই দিন, যেদিন আন্দোলনটি কার্যত একটি জাতীয় ছাত্র আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে। রাজধানী থেকে বিভাগীয় শহর, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক, সর্বত্র শিক্ষার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণ করে যে বিষয়টি আর কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি তরুণ সমাজের বৃহত্তর অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সমতার প্রশ্নে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী দিনগুলোর আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা, শিক্ষকদের সমর্থন এবং দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের সমন্বিত কর্মসূচি আন্দোলনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সংগঠিত আন্দোলনের প্রস্তুতির বার্তা দেয়।

ফলে ২০২৪ সালের ৫ জুলাই কেবল একটি আন্দোলনের কর্মসূচির দিন নয়, বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজের ঐক্য, প্রতিবাদ এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। পরবর্তী দিনগুলোতে যে আন্দোলন বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করেছিল, ৫ জুলাই ছিল তার অন্যতম শক্তিশালী প্রস্তুতির দিন।