মোঃ আব্দুল রহমান
শেষ হয়ে যাচ্ছে আষাঢ়ষ্য দিনলিপি। একদিন পরেই শ্রাবণ। বর্ষাবাহী মৌসুমি বায়ু সারা দেশে সক্রিয়ভাবে বিস্তৃত হয়েছে। দেশ জুড়ে চলছে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ। রাজধানী ঢাকায় গতকাল ভারী বৃষ্টিপাত না হলেও বৃষ্টির আবহ বিরাজ করছে। অলিগলিতে এখনো পানি জমে আছে।
রোববার সকাল ৬টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টায় রাজধানীতে ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল সোমবার ঢাকায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৯৭ মিলিমিটার। বহু জেলায় ভারী বৃষ্টির দাপট থামেনি। চট্টগ্রাম শহরের আমবাগান এলাকায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৭৪ মিলিমিটার। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী দুই দিন বৃষ্টিপাতের প্রকোপ কিছুটা কমে আসলেও ১৬ ও ১৭ জুলাই হতে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা আবার বাড়তে পারে। আজ সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের সব বিভাগে বৃষ্টিপাতের প্রকোপ কিছুটা কমে আসবে। এ সময়ে সারা দেশের ৭৬-১০০ ভাগ এলাকায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ সময়ে দিনের তাপমাত্রা ৩১-৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতের তাপমাত্রা ২৪-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। আগামী ১৬ জুলাই থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় সারা দেশে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে। এ সময় সারা দেশের অধিকাংশ স্থানে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গতকাল সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর চারটি পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর মধ্যে সুরমা নদীর সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার ১৫ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ২৭ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপত্সীমার সামান্য ওপরে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ ছাড়া নেত্রকোনার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপত্সীমার আট সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। একই সঙ্গে সুরমা নদীর কানাইঘাট, সিলেট সদর ও সুনামগঞ্জ, তিস্তা নদীর ডালিয়া ও কাউনিয়া এবং মুহুরি নদীর হরিপুর পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু বর্তমানে আরো সক্রিয় হয়ে পড়েছে। এ কারণে নতুন করে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। তবে আজ মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে। এরপর বৃহস্পতিবার থেকে মৌসুমি বায়ু আবার সক্রিয় হলে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে।
কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ধীরগতিতে অগ্রসর হওয়ায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয়বাষ্প বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, ভারতের ত্রিপুরা এবং মিয়ানমারের রাখাইন পর্বতমালায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ওরোগ্রাফিক প্রভাবে এসব এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
এদিকে আবহাওয়াবিদগণ জানান, মৌসুমি বায়ু আরো সক্রিয় হয়ে ওঠায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। টানা এই বর্ষণের পেছনে রয়েছে উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপ, মৌসুমি বায়ুর অস্বাভাবিক সক্রিয়তা, বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তিত গতিপথ এবং এল নিনোর প্রভাব। গতকাল পাউবোর নিয়মিত বন্যা পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ৯ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোথাও কোথাও নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা অথবা বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি অথবা বিদ্যমান পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। তবে পার্বত্য অঞ্চলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আভাস দিয়েছে সংস্থাটি। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরি নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে।
ভারী বৃষ্টিতে গুলশান-শাহজাদপুর লিংক রোডে ধস :টানা ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর গুলশান-শাহজাদপুর লিংক রোডের একটি অংশ ধসে পড়েছে। দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা এবং পানির তীব্র চাপে সড়কের নিচের মাটি সরে যাওয়ায় গতকাল সোমবার রাতে এ ধসের সৃষ্টি হয়েছে। এতে সড়কটিতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। ধসে যাওয়া অংশটি ঘিরে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ট্রাফিক পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় এই রুটে যানবাহনগুলোকে সতর্কভাবে চলাচলের জন্য আমরা নির্দেশনা দিচ্ছি। রাস্তার সমস্যার কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।