কক্সবাজারপ্রতিনিধি,
টানা আট দিনের ভারী বর্ষণ শেষে কক্সবাজারে প্লাবিত এলাকার পানি নামতে শুরু করেছে। রবিবার (১২ জুলাই) রাত ও সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় প্লাবিত এলাকার পানি নামতে শুরু করে। এতে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তালিকা করেছে জেলা প্রশাসন।
এতে প্রাণহানি, বসতবাড়ি, মৎস্য খাত, কৃষি, সড়ক, বেড়িবাঁধে ভাঙনসহ ব্যাপক ক্ষতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। পানি একেবারে নেমে গেলে আরো ক্ষত স্পষ্ট হবে এবং তখনই পরিপূর্ণ ক্ষতি নিরূপণ সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা নয় দিনে কক্সবাজারে মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৪ মিলিমিটার।
জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ৪৯শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং অন্তত আড়াই লাখের অধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়ে পড়েন।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পেকুয়া উপজেলার ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এরপর মাতামুহুরীতে ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ায় ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ায় ৬৫ শতাংশ এবং মহেশখালীতে ৫০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। রামু উপজেলার ৩৫ শতাংশ, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ২৫ শতাংশ করে এবং ঈদগাঁও উপজেলার ৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১৩জন রোহিঙ্গাসহ ৩২জনের মৃত্যু হয়েছে। একজন নিখোঁজ রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে উখিয়া উপজেলায়। সেখানে পাহাড়ধসে ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ ১৪ জন মারা গেছেন। চকরিয়ায় মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের এবং একজন নিখোঁজ হন। এ ছাড়া কক্সবাজার সদরে তিনজন, পেকুয়ায় দুজন ও রামুতে তিনজন, এবং মাতামুহুরী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে মারা যান।
প্রশাসনেট প্রাথমিক তথ্য আরো বলছে, আট দিনের বৃষ্টি ও বন্যায় কক্সবাজারে এক হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়ায়। উপজেলাটিতে ৪৫০টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য মিলেছে।
এরপর চকরিয়ায় ৩০০টি, কুতুবদিয়ায় ২৫০টি, মহেশখালীতে ২০০টি এবং মাতামুহুরীতে ১৯০টি, টেকনাফে ১০০টি, উখিয়ায় ৫০টি, ঈদগাঁওয়ে ৩০টি, রামুতে ২৫টি এবং কক্সবাজার সদর উপজেলায় ১৮টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে জেলা প্রশাসন।
এছারাও, কক্সবাজার জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, মৎস্য খাতে প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় জেলার ১০ উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়গুলোর মোট আয়তন প্রায় ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর।
তিনি আরো বলেন, এসব পুকুর ও ঘের থেকে এক হাজার ৯৭ টন মাছ, ৩৮৫ টন চিংড়ি, ৩ কোটি ৫৬ লাখ মাছের পোনা এবং ২ কোটি ২১ লাখ চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি ৭৬৮টি পুকুর, ঘের ও খামারের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানবরজ ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজিসহ ৪ হাজার ২১১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক ক্ষতিগ্রস্ত জমির মধ্যে, চকরিয়ায় এক হাজার ৬৬১ হেক্টর, কুতুবদিয়ায় এক হাজার ১২০ হেক্টর, পেকুয়ায় ৫০০ হেক্টর, রামুতে ৩৪০ হেক্টর, মহেশখালীতে ২৩৭ হেক্টর, টেকনাফে ১৪০ হেক্টর, কক্সবাজার সদরে ৮৮ হেক্টর, ঈদগাঁওয়ে ৭৫ হেক্টর এবং উখিয়ায় ৫০ হেক্টর রয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, জেলার নয় উপজেলায় মোট ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে চকরিয়ায় ১৩ হাজার ৮৫২ জন, পেকুয়ায় ৭ হাজার ২০ জন, কুতুবদিয়ায় ৬ হাজার ৪১৫ জন, রামুতে ৪ হাজার ৮৭৫ জন, মহেশখালীতে ৪ হাজার ৩২০ জন, টেকনাফে ৩ হাজার ১২০ জন, ঈদগাঁওয়ে এক হাজার ৩০৪ জন, কক্সবাজার সদরে এক হাজার ১৬৬ জন এবং উখিয়ায় এক হাজার ১৩৮ জন কৃষক রয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, এটি প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে যাচাই শেষে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, পানি উন্নয়ন বিভাগ-১-এর আওতাধীন ৩৮০ দশমিক ২৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে টানা বৃষ্টিতে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ৪৪টি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে। বৃষ্টি কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, কক্সবাজারে মোট ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চকরিয়ায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক এবং ২০টি সেতু-কালভার্ট, মাতামুহুরীতে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট, এবং পেকুয়ায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও দুটি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজার সদরে ২০ কিলোমিটার, রামুতে ৫০ কিলোমিটার, কুতুবদিয়ায় ৯ কিলোমিটার, উখিয়ায় ৬ কিলোমিটার, টেকনাফে ৫ কিলোমিটার এবং ঈদগাঁওয়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতু ও কালভার্টের মধ্যে টেকনাফে ১৫টি, উখিয়ায় ১২টি, রামুতে ৫টি, কক্সবাজার সদরে ৪টি, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় দুটি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তথ্য মতে, কক্সবাজারে মোট ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায়। এই দুই উপজেলায় ১৫টি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য উপজেলাগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতির কোনো তথ্য জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।
জেলা প্রশাসন জানায়, নয় দিনে জেলার ৬১৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৫৮০ জন মানুষ আশ্রয় নেন। প্লাবিত এলাকার দুর্গতদের ৭৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ২৯৮ টন চাল ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণের আরো চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, রবিবার রাত থেকে ভারী বর্ষণ বন্ধ রয়েছে কক্সবাজারে। তবে, পুরো জেলার আকাশ মেঘে ঢাকা। জলমগ্ন এলাকার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কমেনি পানিবন্দি মানুষের। এখানো ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে রয়েছে। কেউ স্বজনদের বাসায় আবার কেউ আশ্রয় কেন্দ্রে এবং কেউ সগকের কিনারে তাবু টানিয়ে অবস্থান করছেন। পানিবন্দি দুর্যোগে নলকূপ ডুবে থাকা এবং রান্নার চুলা জ্বালানো অসম্ভব হয়ে উঠায় চরম খাদ্য ও পানি সংকটে ভোগছে দুর্গত লোকজন।
দুর্গত এলাকায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশসহ নানাজন সহযোগিতা নিয়ে মাঠে রয়েছে। কিন্তু দুর্গত লোকজনের চেয়ে ত্রাণ অপ্রতুল বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি সুপেয় পানির। ছোট বাচ্চা ও বয়োবৃদ্ধদের নিয়ে যত ভোগান্তি বানভাসি মানুষের।
এরই মাঝে, সোমবার রাতে জেলা প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মতবিনিময় করেছে দুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণের তাৎক্ষণিক চাহিদা পুরণে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হয়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার আসা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য অমিত।
মতবিনিময় শেষে রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষের পাশে সরকার রয়েছে। যে যেভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের কাছে দ্রুত সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেয়া হবে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে নেয়া হবে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ।
অনিন্দ্য অমিত আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়ে তাকে কক্সবাজারে পাঠিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা হলো, কোনো মানুষ যেন অনাহারে না থাকে এবং কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার যেন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়। আমরা শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাই যে সরকার মানুষের পাশে রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেক দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সব জায়গায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে প্রশাসনের সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব এলাকায়ও দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।যেখানে জেলা প্রশাসনের পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, নৌবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী কাজ করছে। আমাদের লক্ষ্য প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নানের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় কক্সবাজার সদর আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, জেলা পরিষদের প্রশাসক নুরুল বশর চৌধুরী, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেই সভায় গত আট দিনের বন্যায় প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা উপস্থাপন করা হয়।