নিজস্ব প্রতিবেদক
এসএসসির ফল প্রকাশের পর গতকাল রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস। ফল হাতে পেয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে তারা -জয়ীতা রায়
এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় গড়ে পাস করেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। ২০০৭ সালের পর এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে পরীক্ষার্থী ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। এবার পূর্ণাঙ্গ জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬, গত বছর যা ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২।
গতকাল সকাল ১০টায় একযোগে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের (নয়টি সাধারণ, একটি কারিগরি ও একটি মাদ্রাসা বোর্ড) ফল প্রকাশ করা হয়। সচিবালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মন্ত্রী বলেন, পরীক্ষার ফল ভালো হয়েছে। প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়ায় পাসের হার কমেছে। কারও সন্দেহ থাকলে পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করতে পারবে।
এবারের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট পরীক্ষার্থীর ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং উত্তীর্ণদের ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। এবারও পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়া সংখ্যার দিক দিয়ে এগিয়ে আছে মেয়েরা। ছাত্রদের পাসের হার যেখানে ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের মধ্যে ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ পাস করেছে। পূর্ণাঙ্গ জিপিএ, অর্থাৎ পাঁচে পাঁচ পাওয়া ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৩ হাজার ৮৯৬ ছাত্রী এবং ৫২ হাজার ৭৮০ ছাত্র।
জিপিএ-৫ যে কারণে ফল বিপর্যয় : নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষা দিয়েছে ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯। এর মধ্যে মানবিক বিভাগেই পরীক্ষার্থী ছিল ৪৪ শতাংশ। আর এই বিভাগে শতকরা ৫১ জনই অনুত্তীর্ণ হয়েছে। সেই সঙ্গে মাদ্রাসা বোর্ডে ২ লাখ ৬০ হাজার ১৩২ পরীক্ষার্থীর মধ্যে শতকরা ৪৪ দশমিক ৫১ জন অকৃতকার্য হয়েছে। কারিগরি বোর্ডেও গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক পাসের হারে।
১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন : ২০০৭ সালের পর চলতি বছরই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার সবচেয়ে কম। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। পরের বছরই তা বেড়ে ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এরপর আর কখনো এই সীমার নিচে নামেনি। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছর পাসের হার ছিল ৮০ শতাংশের ওপরে। করোনার সময় পরীক্ষার পদ্ধতি ও মূল্যায়নে বিশেষ ছাড় দেওয়ায় ২০২১ সালে রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে পাসের হার। ২০২৪ সালে ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে। চলতি বছর আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফল : এবার পাসের হার ঢাকা বোর্ডে ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, রাজশাহীতে ৬৩ দশমিক ৬৭, কুমিল্লায় ৬৫ দশমিক ৪২, যশোরে ৬৬ দশমিক ২৭, চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮, বরিশালে ৬০ দশমিক ৩৫, সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক ০৫, ময়মনসিংহে ৫৭ দশমিক ৩৯, মাদ্রাসা বোর্ডে ৫৫ দশমিক ৪৯ এবং কারিগরি বোর্ডে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
এবারও এগিয়ে মেয়েরা : পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যায় সব বোর্ডে এগিয়ে আছে মেয়েরা। ছাত্রদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের মধ্যে ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন ছাত্রী এবং ৫২ হাজার ৭৮০ ছাত্র। গত বছরও পাসের হারে ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ এগিয়ে ছিল মেয়েরা। ছেলেদের চেয়ে ৮ হাজার ২০০টি বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছিল মেয়েরা।
৩১২ প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি : এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩০ হাজার ৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন পরীক্ষার্থীও পাস করেননি। এর মধ্যে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি (ঢাকা ৬টি, রাজশাহী ৫টি, যশোর ১১টি, চট্টগ্রাম ৮টি, বরিশাল ৫টি, দিনাজপুর ১৮টি ও ময়মনসিংহ ৪টি), মাদ্রাসা বোর্ডের ২২৬টি ও কারিগরি বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কুমিল্লা ও সিলেট বোর্ডে একজনও পাস করেনি এমন প্রতিষ্ঠান নেই। এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গত বছর ছিল ১৩৪টি ও তার আগের বছর ছিল ৫১টি।
কমেছে শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠান : এ বছর ৬৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ৯৮৪টি, ২০২৪ সালে ছিল ২ হাজার ৯৬৮টি। শতভাগ উত্তীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহ বোর্ডে ২৪৬টি। সবচেয়ে কম সিলেট বোর্ডে ৯টি। এ ছাড়া ঢাকা বোর্ডে ৮২টি, রাজশাহীতে ৩৫টি, কুমিল্লায় ২৪টি, যশোরে ৩৬টি, চট্টগ্রামে ২১টি, বরিশালে ১৫টি, দিনাজপুরে ২৪টি, মাদ্রাসা বোর্ডে ৮৮টি ও কারিগরি বোর্ডে ৮৯টি।
রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের শতভাগ পরীক্ষার্থী এসএসসিতে পাস করেছে। ৯০৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৭৪ জনই পেয়েছে জিপিএ-৫। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইফুল হক আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রমই এ সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। পাশাপাশি শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় সফলতা ধরে রাখতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি।
পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ায় এগিয়ে যারা : এবার পাসের হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বোর্ডে, ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম মাদ্রাসা বোর্ডে, ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছে ঢাকা বোর্ডে ৩৩ হাজার ২৫৩। সবচেয়ে কম পেয়েছে বরিশাল বোর্ডে ২ হাজার ৭৭৮। তবে পরীক্ষার্থীর শতকরা বিচারে সবচেয়ে বেশি জিপিএ-৫ পাওয়ার হার রাজশাহী বোর্ডে ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ, সবচেয়ে কম মাদ্রাসা বোর্ডে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
কমছে পরীক্ষার্থী ও ফলাফলে ধারাবাহিক পতন : ২০২৪ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয় ২০ লাখ ১৩ হাজার ৫৯৭ জন। পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯। ২০২৫ সালে অংশ নেয় ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ জন। পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২। ২০২৬ সালে অংশ নেয় ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী। পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে পরীক্ষার্থী কমে ১ লাখ ৯ হাজার ৫১১। জিপিএ-৫ কমে ৪৩ হাজার ৯৭টি। আবার ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছর পরীক্ষার্থী কমেছে ৭৪ হাজার ৬০১। জিপিএ-৫ কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬টি। ধারাবাহিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমায় ঝরে পড়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মাদ্রাসায় বড় ধস : চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। এ বোর্ডে এবার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। ২০২৪ সালে মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ, ২০২৫ সালে কমে হয় ৬৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। চলতি বছর এক ধাক্কায় পাসের হার ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ কমেছে। মাদ্রাসা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬, যা পরীক্ষার্থীর শতকরা বিচারে সবচেয়ে কম (২ দশমিক ২৬ শতাংশ)।
কারিগরিতেও টানা পতন : এ বছরের ফলাফলে মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ে পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে থাকলেও গত পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে পাসের হার কমছে কারিগরি বোর্ডে। কারিগরি বোর্ডে ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৮১ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ২০২৫ সালে ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ ও চলতি বছরে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন যেভাবে : যেসব পরীক্ষার্থী আশানুরূপ ফল পাননি, তারা আজ থেকে খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করতে পারবেন। সুযোগ থাকবে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত। ঢাকা বোর্ড এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এবার https://rescrutiny.eduboardresults.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে নির্ধারিত স্থানে রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর পূরণ করতে হবে এবং বোর্ড ড্রপ ডাউন থেকে বোর্ড নির্বাচন করে খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করতে হবে শিক্ষার্থীদের। সেখানে মোবাইল নম্বর দিতে হবে। পুনর্নিরীক্ষণের ফলাফল প্রকাশিত হলে ওই নম্বরে এসএমএস পাঠানো হবে। প্রতিটি পত্রের জন্য ১৫০ টাকা হারে ফি দিতে হবে পরীক্ষার্থীদের।