মির্জা আব্দুর রব বুলবুল, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা। কালের বির্বতনে অযতœ অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে এ নয়নাভিরাম বিল-
ঝিলে ভাসা ফুল। এটা একটি জলজ উদ্ভিদ। অভিজ্ঞজনেরা মনে করেন এটা অনেক দিন
আগের পুরানো ফুল। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সচরাচর পাঁচ প্রকার শাপলা ফুল দেখা যায়। এক সময়ে গ্রাম-বাংলার খাল, বিল-ঝিলে ও পুকুরে বর্ষাকালে নানা রঙের শাপলার বাহারী রুপে মানুষের নয়ন জুড়িয়ে যেত। শাপলা ছোট বাচ্চাদের খুবই প্রিয়।যেমন সাদা, বেগুনি, লাল, হলুদ ও নীল রঙের শাপলা ফুল, তন্মধ্যে সাদা শাপলা বাংলাদেশের
জাতীয় ফুল হিসেবে স্থান পেয়েছে। আবহমান গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে বর্ষা মৌসুমে এক সময়ে গ্রাম-বাংলার খাল, বিল-ঝিল ও ডোবায় অহরহ প্রচুর পরিমাণে এ ভাসমান ফুল দেখা যেত। তবে অভিজ্ঞজনেরা মনে করেন অযতœ অবহেলা আর কৃষি জমিতে অধিক পরিমাণ কীটনাশক, রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা ক্রমান্বয়ে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক জাতীয় ফুল শাপলা। দেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলের জলাশয় ভরাট করে অপরিকল্পিত নগরায়ন, বাড়িঘর তৈরি করা, খাল-বিলের জমিতে পুকুর খনন ও বাঁধ দিয়ে
মাছের খামার তৈরি করাসহ নানাবিধ কারণে জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাবে শাপলা ফুলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া আগের মত বর্ষার পানি না হওয়া, সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হওয়া, নির্ধারিত সময়ে পূর্বেই খাল, বিল-ঝিলের পানি শুকিয়ে
যাওয়ার ফলে আবহমান গ্রাম-বাংলার চিরায়িত রূপ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম-বাংলার কৃষি জমিতে অত্যধিক পরিমাণ কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে স্বাভাবিকভাবে কৃষি জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে শাপলা
জন্মানোর পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। প্রাচীনকাল থেকে বিংশশতাব্দী পর্যন্ত নতূন কর্ম- সংস্থান হিসেবে বর্ষা মৌসুমে দেশের হাজার হাজার মানুষ খাল,বিল-ঝিল থেকে শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। শাপলা বর্ষাকালে
এমনিতেই প্রাকৃতিকভাবে খাল,বিল-ঝিলে জন্ম নেয়, এদের কোন প্রকার যতœ ও পরিচর্যা করতে হয় না। এখন গ্রাম-বাংলার খাল,বিল-ঝিলে শাপলার দেখা পাওয়া যায় না। প্রতিবছর আষাঢ় মাস থেকে শুরু হয়ে প্রায় কার্ত্তিক মাস পর্যন্ত দেশের খাল,
বিল-ঝিলে শাপলা পাওয়া যায়। বর্তমান দেশের প্রেক্ষাপটে শাপলার চাহিদা ব্যাপক। কিন্তু গ্রাম-বাংলার খাল, বিল-ঝিলে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত পরিমাণ শাপলা পাওয়া যায় না। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে গ্রামাঞ্চল থেকে শহর ও রাজধানীর বাজারগুলোতে শাপলা সহজে পৌঁছানো যায়। গ্রাম-বাংলার অবহেলিত নারী ও পুরুষেরা দেশের বিভিন্ন খাল, বিল-ঝিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি খুচরা ও পাইকাররা শাপলা কিনে দেশের সকল জেলা শহর ও রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করে থাকেন। সরেজমিনে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১০ থেকে ১২টি শাপলা একত্র করে একটি আটি বাঁধা হয়েছে। গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে এক আটি শাপলার দাম ১০ থেকে ১২ টাকা পক্ষান্তরে শহরে বা রাজধানীর বিভিন্ন বাজারগুলোতে ২০ টাকা থেকে ২৫ টাকায় এক আটি শাপলা বিক্রি হয়ে থাকে। শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। গ্রাম-বাংলার নি¤œ আয়ের মানুষগুলো বর্ষাকালে শাপলা ফুল বিক্রি করে তাদের সংসার চালায়। শাপলা ফুল দেখতে খুবই সুন্দর, তরকারি হিসেবে খেতেও খুবই সুস্বাদু। শাপলার দাম কম হওয়ায় নি¤œ আয়ের মানুষের কাছে এর চাহিদা ব্যাপক। শাপলা খেতে সুস্বাদু হওয়ায় ধনী মানুষেরাও খেয়ে থাকেন। বর্ষাকালে খাল ও বিল-ঝিলের পাড়ের মানুষের কাজ-কর্ম কম থাকে। তাই এ সময়ে দেশের কৃষক, যুবক ও অন্যান্য পেশার মানুষ বেকার থাকে তাই তারা এ সময়ে
শাপলা বিক্রি করে তাদের সংসার চালায়। পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ শাপলা একদিকে যেমন সবজির চাহিদা মেটাচ্ছে অন্যদিকে বর্ষাকালে কাজ না থাকায় বেকার ও শ্রমজীবিদের আয়ের পথ সৃষ্টি করে থাকে। জাতীয় ফুল শাপলাকে রক্ষা করতে হলে সরকারী ও বে-সরকারীপৃষ্ঠপোষকতায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার বলে গ্রাম-বাংলার প্রবীণব্যক্তিবর্গরা
জানান।