আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘদিন ধরে চলা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনা হঠাৎ ভেস্তে যাওয়ার পর কানাডার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দফায় আরোপিত শুল্ককে বড় ধরনের ‘ভুল হিসাব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কানাডাকে আঘাত করা এবং বিভক্ত করার উদ্দেশ্যে।
শনিবার সকালে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি স্পষ্ট জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দাবি করেছিল, কিন্তু বিনিময়ে দিয়েছে খুবই সামান্য। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা ভেঙে পড়ার পর দুই মিত্র দেশের দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্ক চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে এবং এর ফলে কানাডা এখন কার্যত এক বাণিজ্যযুদ্ধের মুখে উপনীত হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন শুল্কের সমপরিমাণ অর্থাৎ ‘ডলারে ডলারে’ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। কানাডার পক্ষ থেকে স্টিল, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ওপর এই শুল্ক বসানো হবে। হঠাৎ করেই দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। চলতি সপ্তাহের শুরুতে একটি ইতিবাচক চুক্তির বিষয়ে উভয়পক্ষ আশাবাদী হলেও শেষ মুহূর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে শর্ত পরিবর্তনের অভিযোগ তোলায় আলোচনা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়।
সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ার পরপরই কানাডীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। এই নতুন শুল্ক আগে থেকে বহাল থাকা অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, মোটর গাড়ি এবং কাঠপণ্যের শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে যুক্ত হবে। তবে এই নতুন শুল্কের আওতা কিছুটা সীমিত; এটি কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৭ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের রফতানির ওপর প্রভাব ফেলবে, যা মোট আমদানির প্রায় ৫ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াইন, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক এবং হকি খেলার সরঞ্জাম।
প্রধানমন্ত্রী কার্নি জানিয়েছেন, অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেশের স্বার্থ রক্ষায় কানাডা এই পাল্টা পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতে এর বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হবে।
ঐতিহাসিক এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পেছনে দুই পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে। কার্নি শুক্রবার রাতে প্রথম জানান যে কোনো চুক্তি হচ্ছে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তে অনুচিত ও অর্থহীন শর্ত আরোপের অভিযোগ তোলেন। এর জবাবে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জ্যামিসন গ্রিয়ার ফক্স নিউজকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি দাবি করেন, চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু শুল্ক কমাতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু কানাডাই নতুন নতুন দাবি তুলে এবং আগের মেনে নেওয়া শর্ত থেকে সরে গিয়ে পরিস্থিতি জটিল করেছে।
তবে কার্নি এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ওয়াশিংটন এমন কিছু অন্যায্য শর্ত দিয়েছে যার ফলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে কানাডার মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি করার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে খর্ব হতো। কানাডা শেষ মুহূর্তে নতুন কিছু চায়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া অফারটি স্পষ্ট করতে চেয়েছিল যা তাদের বারবার হতাশ করেছে।
ওয়াশিংটনের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অভূতপূর্ব ঐক্য দেখা গেছে। দেশের বিরোধীদলীয় কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পোইলিভ্রে নতুন মার্কিন শুল্ককে সম্পূর্ণ ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কানাডার সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না। অন্যদিকে, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন দাবি মেনে নেওয়ার অর্থ হবে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যের অর্থনৈতিক সমকক্ষে নামিয়ে আনা, যা দেশের মানুষের কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া কেবেক প্রদেশের প্রিমিয়ার ক্রিস্টিন ফ্রেচেট সতর্ক করে বলেছেন, এর ফলে অনেক মানুষ চাকরি হারাবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোকে সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবশ্য আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ উভয়পক্ষকে পুনরায় আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা বাণিজ্য আলোচনা শেষ পর্যন্ত গভীর সংকটে রূপ নিল। উভয় দেশই মেক্সিকোর সঙ্গে ইউএসএমসিএ নামক উত্তর আমেরিকার ত্রিদেশীয় মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনায় যুক্ত ছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে ১৯৯৪ সালের নাফটা চুক্তির পরিবর্তে এটি সই হয়, যা বর্তমানে বার্ষিক ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য পরিচালনা করে। চলতি বছরের শুরুতে কানাডা ও মেক্সিকো এই চুক্তিটি আরও ১৬ বছরের জন্য নবায়নের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানালেও যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যমান কাঠামোতে তা নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায়।
শুক্রবারের এই আলোচনার ধস ইউএসএমসিএ চুক্তির ওপর কী প্রভাব ফেলবে—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী কার্নি মন্তব্য করেন, এটি অবশ্যই ভালো কোনো সংকেত নয়।
সূত্র: বিবিসি