সম্পাদকীয়
বিশ্বের অগ্রসর বিমানবন্দরগুলো শুধু আধুনিক অবকাঠামোর কারণে এগিয়ে নেই; সেখানে নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা, প্রযুক্তি, জনবল ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন দক্ষতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়।
একটি দেশে বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে বিমানবন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহজ ও দ্রুততম সময়ে যাতায়াতের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্য, পর্যটন খাতের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার হওয়া চাই। সেই সঙ্গে সেবার মানও হতে হবে উন্নত। সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি, দুর্বল তদারকি, অব্যস্থাপনা ইত্যাদি কারণে সংঘটিত যেকোনো দুর্ঘটনা, অনিয়ম উড়োজাহাজ ও বিমানবন্দর অবকাঠামোর জন্য বড় ঝুঁকি এবং যাত্রীদের জন্য ভোগান্তি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের আস্থা, বিদেশী যাত্রী ও কার্গো পরিবহন এবং দেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সরাসরি বিমান যোগাযোগের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিমানবন্দরের অবকাঠামো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরাপদ, দক্ষ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও ততটাই জরুরি।
দেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা লক্ষ করা যায়। যাত্রীদের লাগেজ পেতে দীর্ঘ লাইনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে। ট্রলি সংকটের কারণে সৃষ্ট ভোগান্তিরও অসংখ্য নজির রয়েছে। প্রায়ই লাগেজ কাটা, লাগেজ থেকে মালপত্র চুররি ঘটনাও ঘটে। এগুলো নিরাপত্তাহীনতা ও অনুন্নত সেবারই উদাহরণ। গত ১৬ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একাধিক নিরাপত্তা স্তর পেরিয়ে ৩১ রাউন্ড তাজা গুলিভর্তি একটি ব্যাগ দিল্লিগামী বিমানে চলে যায়। ঢাকায় দুই দফা স্ক্যানিংয়ের পরও গুলি শনাক্ত হয়নি; দিল্লি বিমানবন্দরে তা ধরা পড়েছে। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একাধিক নিরাপত্তা স্তর থাকার পরও গোলাবারুদ শনাক্ত না হওয়ার ঘটনা নিছক কর্মীর ভুল হিসেবে দেখলে এর কাঠামোগত দিকটি উপেক্ষিত হতে পারে। এক্ষেত্রে স্ক্রিনিং প্রযুক্তি, জনবলের দক্ষতা, দায়িত্ব বণ্টন, তদারকি ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয়—সবকিছুর কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি সামগ্রিকভাবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির কিছু তথ্য জানা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্টের সর্বশেষ নিরাপত্তা অডিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৪ শতাংশ ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৮ শতাংশ স্কোর করেছে, যা আগের বছরে ছিল যথাক্রমে ৯৩ ও ৯৪ শতাংশ। কার্গো-সংক্রান্ত অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল্যায়নে শতভাগ কমপ্লায়েন্সও পাওয়া গেছে। এসব ফলাফল ইতিবাচক হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজন যে রয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাই তা মনে করিয়ে দেয়। শিগগিরই আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রাম—কন্টিনিউয়াস মনিটরিং অ্যাপ্রোচ অডিটে বেবিচকের সদর দপ্তর, শাহজালাল ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন কাঠামো পর্যালোচনা করার কথা রয়েছে। সুতরাং অডিট সামনে রেখে প্রস্তুতি নেয়া এবং অভ্যন্তরীণভাবে ঘাটতি চিহ্নিত করার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
এরই মধ্যে বিমান নিরাপত্তা বিষয়ে আলাদা এয়ার নেভিগেশন অর্ডার জারি হয়েছে। পাশাপাশি নতুন স্ক্যানিং সরঞ্জাম, এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেক্টর, বডি স্ক্যানারসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সরঞ্জাম যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বেবিচক জনবল ও কিছু নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতির কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদে ঘাটতি দূর করাও সমান জরুরি।
কারণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রযুক্তিনির্ভর হলেও প্রযুক্তি একা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। স্ক্যানার কতটা আধুনিক, পাশাপাশি সেটি পরিচালনাকারী কতটা দক্ষ, সতর্ক ও দায়িত্বশীল সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা যাচাই, দায়িত্বের প্রতি পেশাদার মনোভাব, ভুল হলে জবাবদিহি এবং নিয়োগ ও পদায়নে যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কর্মরত ব্যক্তির সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে এ খাতে পেশাদারত্বের বিকল্প নেই।
বিশ্বের অগ্রসর বিমানবন্দরগুলো শুধু আধুনিক অবকাঠামোর কারণে এগিয়ে নেই; সেখানে নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা, প্রযুক্তি, জনবল ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন দক্ষতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়। এক্ষেত্রে যাত্রী অভিজ্ঞতা পরিমাপের আন্তর্জাতিক কর্মসূচি এয়ারপোর্ট সার্ভিস কোয়ালিটি (এএসকিউ) গুরুত্বপূর্ণ একটি মানদণ্ড। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের একাধিক বিমানবন্দর নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করছে। গত বছর এএসকিউ কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স অ্যাওয়ার্ডসে বিশ্বের ১০০টি বিমানবন্দরকে বিভিন্ন বিভাগে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবস্থান এখনো সন্তোষজনক নয়। স্কাইট্র্যাক্সের ২০২৫ সালের বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বিমানবন্দরের তালিকায় ঢাকার বিমানবন্দরের নাম নেই। ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ১০ বিমানবন্দরের তালিকায়ও ঢাকা নেই; সেখানে দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, মুম্বাই, কলকাতাসহ দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক বিমানবন্দর স্থান পেয়েছে। স্কাইট্র্যাক্সের আলাদা বিমানবন্দর রেটিংয়ে শাহজালালকে টু-স্টার মূল্যায়ন করা হয়েছে। সেখানে যাত্রীসেবার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার ধীরগতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এ সংস্থার রেটিং ও আইকাওয়ের নিরাপত্তা অডিট একই ধরনের মূল্যায়ন নয়। একটি যাত্রীসেবা ও বিমানবন্দর অভিজ্ঞতা পরিমাপ করে, অন্যটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়টি যাচাই করে। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রের একটি সাধারণ জায়গা রয়েছে—কার্যকর ব্যবস্থাপনা। নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা, পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া—সব ক্ষেত্রেই দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষিত জনবল অপরিহার্য। তাই আইকাও অডিটকে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরীক্ষায় ভালো স্কোর পাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অডিটের পর্যবেক্ষণকে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে নেয়া; নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই; বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দায় এড়ানোর সুযোগ না রেখে ভুলের কারণ অনুসন্ধান ও জবাবদিহির সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের সামগ্রিক সেবার মানোন্নয়নেও জোর দেয়া প্রয়োজন।