কক্সবাজার প্রতিনিধি:
শরমিন সিদ্দিকা লিমার অনেক পরিচয়। কলেজে শিক্ষকতা থেকে শুরু করে বেতার উপস্থাপনা, সংবাদ পাঠ, আবৃত্তি কিংবা নাট্যশিল্প –সবখানেই তাঁর দারুণ বিচরণ। শিক্ষাজীবনে স্নাতকে সারাদেশে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ষষ্ঠ ও চট্টগ্রাম বিভাগে প্রথম হওয়া এ নারী ক্রমশই এগিয়েছেন আপন গতিতে। দ্যুতি ছড়িয়েছেন আপন মহিমায়। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২১ সালে শিক্ষা ও চাকুরি ক্যাটাগরিতে কক্সবাজার জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে অর্জন করেছেন জয়িতা পুরস্কার। অবতীর্ণ হয়েছেন পিছিয়ে থাকা নারীদের কাছে আলোকবর্তিকার ভূমিকায়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সাফল্যের এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে লিমা শিকার হয়েছেন নানা প্রতিবন্ধকতার। তবুও দমে যাননি। পারিবারিক সহযোগিতা ও নিজের একাগ্রতায় পাড়ি দিয়েছেন সমস্ত বন্ধুর পথ। দৈনিক কক্সবাজারকে সেই গল্পই শোনালেন লিমা।
একান্ত আলাপচারিতায় শরমিন সিদ্দিকা লিমা বলেন, ‘আমরা যখন বেতারে প্রথম অনুষ্ঠান করতাম, ভোরবেলা ট্রান্সমিশন ছিলো। ফজরের আজানের পর আমাদের রওয়ানা হয়ে যেতে হতো। বেতারের গাড়ি আসতো বাসার সামনে। ক’দিন পর আমার আব্বুর কাছে খবর এলো মেয়ে ভোর বেলায় কোথাও পালিয়ে গেছে। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়েছে। আমি প্রমিত বাংলায় কথা বলবো, দেখা যায় সেখানেও বিপত্তি। বলে, মেয়েটা বেশি বেশিই করছে। আমাদের মাঝে সচেতনতার ঘাটতি এখনও রয়ে গেছে। পারিবারিক এবং সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা এখনও কম। পরিবার থেকে এখনও ভয় পায় একটা মেয়েকে একা ছেড়ে দিতে। এই জায়গা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
নিজের শিক্ষাজীবনের স্মৃতি রোমন্থন করে লিমা বলেন, ‘আমার শিক্ষা জীবনের শুরুটা কক্সবাজার দিয়েই। বাবা যখনই দেখলেন কক্সবাজারে স্নাতক চালু হয়েছে, তখন তিনি মনস্থির করলেন ঘরের মেয়ে ঘরে থাকাই ভালো। এমন একটা বোধ থেকেই বললেন এখানে ভর্তি হও। ভর্তি হয়ে খুব মন খারাপ হয়েছিল। বাবা বলছিলেন, মন খারোপের কিছু নাই। তুমি যদি ভালো করতে চাও, দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে ভালো রেজাল্ট করে দেখিয়ে দিতে পারো। বাবার কথাটা মনে খুব গেঁথেছিলাম। একটা পর্যায়ে দেখা গেলো, স্নাতক যখন শেষ হলো, আমার বাবার কথাই সত্যি হলো। পুরো দেশে আমি সম্মিলিত মেধা তালিকায় ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেছিলাম। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিভাগে হিসেব করে দেখা গেলো ওখানেও প্রথম স্থান অধিকার করেছি। কক্সবাজার সরকারি কলেজের নামটা উর্ধ্বে রাখতে পেরেছিলাম। দারুণ একটা ভালোলাগা কাজ করেছে তখন। সেই সময়ে যেভাবে আমরা শুরুটা করেছিলাম তা খুব জটিল এবং কঠিন ছিল। শিক্ষা খাত অনেকটাই দুর্বল ছিল।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও শিক্ষকরা বিভিন্ন সময় আমাদের অনুষ্ঠানে ডেকে নিয়ে যেতেন মানপত্র পাঠ করার জন্য। এভাবেই আমার শিক্ষকদের আগ্রহে কারণে সংস্কৃতির প্রতি আমার একটা আকর্ষন নিজের অজান্তেই তৈরি হয়ে যায়। অনেক সময় প্রস্তুতি ছাড়াই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দাঁড়িয়ে যেতাম এবং পুরস্কৃত হওয়ার পর দারুণ ভালোলাগা কাজ করতো। তার মাঝে বাতায়ন খুলে দিয়েছে কক্সবাজার বেতার। ২০০১ সালে বাংলাদেশ বেতারের কক্সবাজারে যে শাখাটি হলো তখন অডিশন দিলাম। দেখলাম প্রথম ৬ জনের মধ্যে একজন আমি। এরপর আবার বেতার থেকে ভয়েস চেক করার পর ডেকে নেয়া হলো প্রথম উপস্থাপনার জন্য। জসিম উদ্দীন বকুল এবং আমি দু’জনের মিলে কক্সবাজারের উপর যে প্রামাণ্যচিত্রটা ছিল সেই ভয়েসটা দিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। সেই থেকে এ পর্যন্ত বেতারের একজন তালিকাভুক্ত উপস্থাপক, ঘোষক ও সংবাদ পাঠিকা হিসেবে, আবৃত্তি শিল্পী, নাট্যশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হই। শিক্ষাজীবনের ফাঁকে দেখা গেলো, রাষ্ট্রীয় যেকোন অনুষ্ঠানে ডাকা হতো। তখন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল এতটা পরিব্যপ্ত ছিল না। তারপরও দেশবিদেশের প্রোগাম করারও সুযোগ হয়েছে। ১৮ দেশের রাষ্ট্রদূত এসেছিলেন। রোড শোতে সারাবিশ্ব থেকে লোকজন এসেছে। আমি সৈকতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে লক্ষ জনতার সামনে উপস্থাপনার সুযোগ পেয়েছি। দিবস ভিত্তিক অনুষ্ঠানগুলো একটানা আমি চালিয়ে গেছি অনেক বছর।’
শিক্ষকতা জীবনের শুরু প্রসঙ্গে লিমা বলেন, কক্সবাজারে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সের জন্য চট্টগ্রামে গিয়েছি। যখন মাস্টার্স শেষ করে বের হলাম তখন মা প্রথম ফোন দিয়ে জানালেন সিটি কলেজে একটা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। আমি চাইলে চেষ্টা করতে পারি। মায়ের সেই ডাকে চলে আসা। ওইসময় চাকুরিতে যে ঢুকলাম, এখনও ওখানেই আছি। সেখানে শিক্ষার্থীদের যে ভালোবাসাটা পাই তা অসাধারণ।’
আলাপকালে ২০২১ সালে জয়িতা পুরস্কার প্রাপ্তির প্রসঙ্গ উঠতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেন শরমিন সিদ্দিকা লিমা। তিনি বলেন, ‘আমাকে খুঁজে নিয়ে যখন শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে ‘জয়িতা’ সম্মাননা দেওয়া হলো সেটিই আমার জীবনের বড় অর্জন। এই ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি পাওয়ার কারনে আমি দারুণভাবে প্রীত হয়েছিলাম। প্রথমে উপজেলা পর্যায়ে, পরে জেলা পর্যায়ে এবং বিভাগীয় পর্যায়েও আমাকে সিলেক্ট করা হলো। বিভাগীয় পর্যায়েও সেই স্বীকৃতিটা আমি পেয়েছি। তবে জাতীয় পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। সেই অতৃপ্তিটা এখনও আছে। স্বপ্ন এখনও আছে। সেই স্বপ্নকে সাথী করে এগিয়ে চলেছি।’
লিমা বলেন, বিভিন্ন সভা-সেমিনারে যখন যাই সেখানে আমি নারীদের জন্য কথা বলার চেষ্টা করি। সমাজ পরিবর্তনে নারীরা যে পিছিয়ে নেই, আমাদের অংশগ্রহনটা যে কতটা জরুরী সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমি সবসময় ভাবি এবং কাজ করার চেষ্টা করি। যেখানেই যাই নারীদের পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করি। রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে যখনই কথা বলার সুযোগ হয় আমি অন্তত আওয়াজ দিই। আমি মনে করি, আমার অধিকার নিয়ে আমি যদি সচেতন না হই, তাহলে আমি কোন জায়গায় আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবো না। আমি বেতারে নারী মহল নামে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করি। সেখানে কেবল নারীদের কথাই থাকে। রেডিওতে তৃণমূল প্রাকৃতজনেরাই সংযুক্ত থাকে। এর মধ্য দিয়ে আমি চেষ্টা করি তাদের সচেতন করে তোলার জন্য। নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি আমি নির্দিধায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই, পথটা দেখানোর চেষ্টা করি।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের বিলাসী, হৈমন্তিরা এখনও আছে। কল্যানীরা এখনও আমাদের সমাজে বর্তমান। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র যাদের লিখে গেছেন, যাদের কথা বলে গেছে তারা এখনও বেঁচে আছে। আবার আমাদের বাংলার ঘষেটি বেগমেরাও আছে। তা না হলে আমরা উৎরে যেতাম। কিন্তু আমাদের এ অবস্থা থেকে বেরোতে হবে।’
শরমিন সিদ্দিকা লিমা বর্তমানে এম এ এস এম ফিল গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি এ্যাডজান্ট ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউটর হিসেবেও পাঠদান করছেন। এছাড়াও শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমির উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন মুক্তি কক্সবাজার এর সঙ্গেও।
লিমা মনে করেন বাবা-মায়ের দিকনির্দেশনায় তিনি আজকের অবস্থানে আসতে সক্ষম হয়েছেন। আছে স্বামীর অকুন্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা। তারা সবসময় লিমাকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।
Leave a Reply