রাবি প্রতিনিধি:
সকাল ৯টা। সকালের কুয়াশা ভেজা ভোর কেটেছে একটু আগেই। সূর্যমামা তার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলের মাঠ পেরোতেই নাকে আসছে পোড়া গন্ধ। অর্ধপোড়া সারিসারি পাঁচটি ট্রাকের কোনটি থেকে তখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। চারপাশে ইট দিয়ে হিমেলের নিহত হওয়ার স্থানটিকে ঘিরে রাখা হয়েছে। একটু পরেই সেখানে উপস্থিত হলো কিছু শিক্ষার্থী।
তাদের সবার হাতেই স্কেস করার জন্য সাদা কাগজ আর বোর্ড। সঙ্গে বিভিন্ন রঙের সমাহারে সাজানো রঙতুলি। হিমেলের নিহত হওয়ার স্থানের পাশে এসে বসলেন তারা। এক এক সবাই শুরু করলেন বিভিন্ন চিত্রকর্ম অঙ্কন।
সামনে গিয়ে জানা যায়, ট্রাক চাপায় নিহত হিমেলের স্মরণে তার সহপাঠীরা নিজেদের রংতুলিতে মৃত্যুর প্রতিবাদ জানিয়ে তাদের এ আয়োজন। তিন দিনব্যাপী এই কর্মসূচির নাম দিয়েছেন ‘শিল্পীর প্রতিবাদ তাঁর শিল্পকর্মে’। কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের আঁকা শিল্পকর্ম দিয়ে কয়েক দিন পর প্রদর্শনীর আয়োজন করবেন তারা।
এবিষয়ে জানতে চাইলে আয়োজকরা বলেন, এই জায়গায় বসে নানারকম প্রতিবাদী চিত্র তৈরি করবেন তারা। সেই চিত্রকর্মগুলো এবং নিহত হিমেলের হাতে গড়া কিছু শিল্পকর্ম দিয়ে একটি প্রদশর্নীর আয়োজন করা হবে।
তারা আরো জানান, হিমেলের মতো একজন শিল্পীকে এভাবে নৃশংসভাবে খুন করবার পিছনে যে অব্যবস্থাপনা দায়ী সে অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মাধ্যম হচ্ছে এই আর্ট ক্যাম্প। আর্ট ক্যাম্প সব স্তরের শিক্ষার্থীরা অংশ নিতে পারবে। তাদের প্রত্যাশা এ আর্ট ক্যাম্পের মাধ্যমে হিমেলের সমস্ত স্মৃতি এসব কাজের মাঝে জমা থাকবে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে হিমেলের বিভাগের বন্ধু মিঠুন চন্দ্র মহন্ত বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আগেও বলা হয়েছে রাস্তা মেরামত এর জন্য, ট্রাক গুলোর গতি নিয়ন্ত্রনের জন্য। কিন্তু কেউ শোনেনি। ফলে সেই রাস্তার কারণে আজ আমরা আমাদের বন্ধুকে হারালাম। এর দায় সম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। কিন্তু তারা আর্থিক সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু আমার বন্ধুর জীবন অর্থের বিনিময়ে কেউ দিতে পারবেনা। এই অব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত কন্ট্রাক্টর এবং দায়ী সবার বিচার করতে হবে পাশাপাশি আমাদের উত্থাপিত দাবি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
হিমেলের মৃত্যুর প্রতিবাদ জানিয়ে চারুকলার এক শিক্ষার্থী এঁকেছেন- পেছনে সুউচ্চ ভবন। তার সামনের রাস্তা দিয়ে ধেয়ে আসছে দানবরূপী এক ট্রাক। ট্রাকের সামনের অংশে মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে রক্তলোলুপ জিহ্বা। এ চিত্রকর্মের ওপরেই লেখা, ‘হিমেল তোর মাথা খাব…’। এভাবেই আরো বিভিন্ন চিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন তাদের প্রতিবাদ।
আরেক শিক্ষার্থী পার্থ রায় এঁকেছেন- ভাঙা মোটরসাইকেল, পাশে পড়ে থাকা বিচ্ছিন্ন মাথা ও একটি ট্রাকের চিত্রকর্ম। চিত্রকর্ম সম্পর্কে জানতে চাইলে পার্থ বলেন, হিমেল ভাই ঠিক এ জায়গাতেই পড়ে ছিলেন। মাথা ছিল না। পাশেই মোটরসাইকেলটা ভেঙেচুরে গেছে। এমন জায়গায় দুর্ঘটনা হয়। এটা ভাবা যায় না।’
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলের সামনে ট্রাকচাপায় মারা যান কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদ হাবিব হিমেল। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এরপর বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। পাঁচ ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরের দিন মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে জানাজা শেষে তার মরদেহ নাটোরে মামাবাড়িতে দাফন করা হয়।
Leave a Reply