কুমিল্লাপ্রতিনিধি:
ফেব্রুয়ারিতে কুমিল্লায় ১৯৩টি গ্রাম আদালতে ৭৩৩টি মামলা, নিষ্পত্তি ৭০১টি
প্রান্তিক মানুষের দ্রুত সময়ের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গ্রাম আদালতকে আরো সক্রিয় এবং কার্যকর করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ছে বিধায় গ্রাম আদালতের আধুনিকায়নে জোর দিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে এ নিয়ে অবহিতকরন সভায় গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেম্বার ও অন্যান্যদের আইনী প্রশিক্ষন এবং আদালত আধুনিকায়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে কুমিল্লা ১৯৩ টি গ্রামে ১৯৩টি গ্রাম আদালতে ৭৩৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। নিষ্পতি হয়েছে ৭০১টি মামলা। সাধারণত গ্রামের ছোটোখাটো ঝগরা-বিবাদ, দ্বন্দ্বÑ যা দ্রুত নিস্পত্তি সম্ভব এমন অভিযোগের ঘটনাগুলোই সহজে গ্রাম আদালতে সমাধান করা হয়।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার (১৪ মার্চ) জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের সাথে অবহিতকরণ সভায় অংশ নেন কুমিল্লার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমান।
পরে সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে এ প্রতিবেদককে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রান্তিক মানুষের ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় গ্রাম আদালতকে আরো সক্রিয় করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গ্রাম আদালতকে কার্যকর করা গেলে এবং তফসিল ভুক্ত মামলাগুলো বিশেষ কোন জটিলতা ছাড়াই গ্রাম আদালতে শেষ করা গেলে আদালতে যে মামলা জট আছে তা কমে আসবে। যে কারণে গ্রাম আদালত আধুনিকায়ন এবং গ্রাম আদালতে সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনকানুনে আরো প্রশিক্ষিত করা জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা হচ্ছে।
কুমিল্লা বুড়িচং উপজেলার ভারেল্লা দক্ষিণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক জানান, গ্রামের মানুষ ন্যায় বিচার চান। যেখানেই সহজেই বিচার পাবেন তারা সেখানেই আসেন। গ্রাম আদালতে মানুষের আস্থা বাড়ছে। আমরাও চেষ্টা করছি মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে।
তবে কিছু প্রতিবন্ধকতার কথাও জানান তিনি। চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বলেন, মামলার শুনানির জন্য আমরা গ্রামপুলিশের মাধ্যমে বাদী বিবাদীকে খবর দেই। কিন্তু তারা আসতে চাইনা। সময় মত না আসলে তাদেরকে জরিমানা করা হয়, সেই জরিমানা আদায়ও বিলম্ব করেন তারা। অন্যদিকে আমার ইউনিয়ন পরিষদ এখনো অস্থায়ী তাই আমার এজলাসও নেই। তারপরও চেষ্টা করি আদালত সময় মত পরিচালনা করতে। মানুষের আস্থা আছে- আমাদের আরো সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে।
জানা গেছে, গ্রাম আদালত হলো গ্রামাঞ্চলের ছোট ছোট দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা নিষ্পত্তির জন্য ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় যে আদালত গঠিত হয় সে আদালত হলো গ্রাম আদালত। সহজ কথায় গ্রাম আদালত আইন ২০০৬ অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদে ২৫ হাজার টাকা মূল্যমানের দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা নিষ্পত্তির জন্য ইউনিয়ন পরিষদে যে আদালত বসে সে আদালতেই হলো গ্রাম আদালত। গ্রাম আদালত গ্রামাঞ্চলের সুবিধা বঞ্চিত অনুগ্রসর জনগোষ্ঠীর সুবিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এখতিয়ার সম্পূর্ন এলাকার জনগণ ফৌজদারী হলে ২টাকা এবং দেওয়ানী হলে ৪টাকা দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে এই মামলা দায়ের করতে পারে। গ্রাম আদালতের এখতিয়ার সম্পূর্ন মামলা অন্য কোন আদালত গ্রহন করতে পারে না। গ্রাম আদালতে মামলা করলে কোন আইনজীবির প্রয়োজন হয় না। যার কারনে মামলা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কোন সুযোগ নেই। স্থানীয় ইউপি সদস্য এবং গন্যমান্য বিচারকের উপস্থিতিতে এই আদালত বসে। যে আদালতে বিচারক সংখ্যা হলো ৫জন। দুই জন মনোনীত সদস্য থাকবেন আবেদনকারীর পক্ষে এবং ২ জন সদস্য হবেন প্রতিবাদীর পক্ষে। যার মধ্যে একজনকে অবশ্যই হতে হবে সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য। স্থানীয় ইউপি সদস্য এবং গন্য মান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে এই বিচার অনুষ্ঠিত হয় বলে এখানে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ার কোন সুযোগ থাকে না।
ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে বিধিবিধান মেনে গ্রাম আদালত যেন সাধারণ মানুষের ন্যায় বিচার ও পূর্ণ আস্থার জায়গা হয়ে ওঠে তাই এসব আদালতগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব থাকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের।
জানা গেছে ফেব্রুয়ারি মাসে বরুড়া উপজেলা ১৫ টি গ্রাম আদালতে তুলনামূলক বেশি মামলা দায়ের হয়েছে এবং নিষ্পত্তিও হয়েছে। বরুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নু এমং মারমা মং জানান, গত মাসে বরুড়ার গ্রাম আদালতগুলোতে ৮১টি মামলা দায়ের হয়েছে এবং ৯০ টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে এখনো এসব আদালতে ৬২টি অনিষ্পন্ন মামলা রয়েছে। আমরা নিয়মিত গ্রাম আদালত সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখি তারা আদালতের রেজিষ্ট্রার আপডেট করছেন কি না বা কারো কোন সমস্যা হচ্ছে কি না। যে সব গ্রাম আদালতে এজলাস নেই সেগুলো আধুনিকায়ন করে স্থাপন করার জন্যও ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গ্রামের মানুষের আস্থা আছে গ্রাম আদালতে প্রতি। আমরা চাই সবাই যেন ন্যায় বিচার পান।
Leave a Reply