1. nskibria2012@gmail.com : যুগ যুগান্তর : যুগ যুগান্তর kibria
সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৯ অপরাহ্ন

কীভাবে চীনা পণ্যের ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ল ভারত?

প্রতিনিধির নাম
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার পঠিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (বামে) ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি/ফাইল ছবি

চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভারসাম্য ফেরাতে বছরের পর বছর নানা পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত। চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানো, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ, চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করা থেকে শুরু করে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর নানা উদ্যোগও নিয়েছে নয়াদিল্লি। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও চীনের ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমার বদলে আরও বেড়েছে।

ভারতের খেলনা শিল্প অবশ্য এই প্রবণতার একটি বিরল ব্যতিক্রম। কয়েক বছর আগেও দেশটির খেলনার বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল চীনের দখলে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং নিম্নমানের বিদেশি খেলনা ঠেকাতে ২০২০ সালে আমদানি করা খেলনার ওপর শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রথমে ৬০ শতাংশ এবং পরে ৭০ শতাংশ করা হয়।

শুরুতে এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি ছিল, স্থানীয় নির্মাতারা বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না। কিন্তু বাড়তি শুল্কের পাশাপাশি কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করার ফলে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

২০২০ সালে প্রায় ৩০ কোটি ডলারের খেলনা আমদানি করত ভারত। চলতি বছর তা কমে প্রায় ১০ কোটি ডলারে নেমেছে। একই সময়ে খেলনা রফতানি প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ফলে চীনা খেলনার ওপর ভারতের নির্ভরতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তবে ভারতের সামগ্রিক চীন-নির্ভরতার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। অর্থনীতিবিদদের মতে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন বিশ্বের অন্যতম অসম সম্পর্কগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়লেও বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতি
২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর দুই দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক ব্যাপকভাবে অবনতি ঘটে। এরপর ভারত চীনা পণ্যের ওপর একাধিক অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে এবং টিকটকের মতো বেশ কিছু জনপ্রিয় চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করে।

কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল, যা চলতি বছর বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর চায়না অ্যানালাইসিসের ফেলো কেভিন জংঝে লি বলেন, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ সম্পর্ক যখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল, তখনও চীনের ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরতা বেড়েছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সময়ে চীনে ভারতের রফতানি মহামারির আগের পর্যায়ের নিচেই রয়ে গেছে। বিপরীতে চীন থেকে ভারতের আমদানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

দিল্লিভিত্তিক গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, ভারতের শিল্পপণ্য আমদানির ৩০ শতাংশের বেশি এখন চীন সরবরাহ করে। পাশাপাশি ১০০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে ভারত চীনের ওপর নির্ভরশীল। এই ভারসাম্যহীনতা ক্রমেই বাড়ছে।
আমদানির বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ১৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে ভারতীয় শিল্পের ওপর চীনের প্রভাব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শুধু পণ্য নয়, উৎপাদনেও চীনের ওপর নির্ভরতা
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- চীনের ওপর নির্ভরতা শুধু তৈরি পণ্য কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির শিল্প খাতের উৎপাদন প্রক্রিয়াতেও চীনা কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও উপকরণের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

স্মার্টফোন ও সৌর সরঞ্জামের মতো তৈরি পণ্যের আমদানির ওপর নির্ভরতা ভারত কিছুটা কমাতে পেরেছে। বর্তমানে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশের বেশি আইফোন ভারতেই উৎপাদিত হয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পণ্যের উৎপাদন এখনও মূলত সংযোজননির্ভর। অর্থাৎ চূড়ান্ত পণ্য ভারতে তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও উপাদান চীন থেকে আমদানি করতে হয়।

জিটিআরআই-এর শ্রীবাস্তব বলেন, শিল্পযন্ত্র, ব্যাটারি তৈরির উপকরণ, রাসায়নিক, সৌরকোষ এবং বিভিন্ন উৎপাদন সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়।

অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট আমদানির মধ্যে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক পণ্যের অংশ প্রায় ৩৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে যন্ত্রপাতি ও মেকানিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্স- ২১ দশমিক ৭ শতাংশ। জৈব রাসায়নিক ও প্লাস্টিকও আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রয়েছে।

ওআরএফ-এর সেন্টার ফর নিউ ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসির ফেলো সৌম্য ভৌমিক বলেন, এসব চীনা পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু ভোক্তা পর্যায়ে সমস্যা তৈরি হবে না; ভারতের শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হবে।

অর্থাৎ চীনা পণ্যের ওপর ভারতের নির্ভরতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আমদানি বন্ধ হলে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কারখানার উৎপাদনও থমকে যেতে পারে।

চীনের অতিরিক্ত উৎপাদনেও চাপ বাড়ছে
ভারতের ওপর চীনা পণ্যের প্রবাহ বাড়ার পেছনে চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ইস্পাত, সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়িসহ বিভিন্ন খাতে চীনের বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু দেশটির অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে সেই বিপুল উৎপাদন শোষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে চীনা নির্মাতারা বিদেশি বাজারে কম দামে পণ্য বিক্রির দিকে আরও বেশি ঝুঁকছেন। চলতি বছরও চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারত বর্তমানে বিভিন্ন খাতে দ্রুত শিল্পায়ন ও উৎপাদন বাড়াচ্ছে। ফলে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও শিল্প উপকরণের চাহিদাও বাড়ছে। এর একটি বড় অংশ পূরণ হচ্ছে চীন থেকে আমদানির মাধ্যমে।
এর পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ও অন্যান্য বিধিনিষেধ বাড়ানোয় চীনা নির্মাতারা ভারতের মতো বড় বাজারের দিকে আরও বেশি নজর দিচ্ছেন।

চীনের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশও কঠিন
ভারতের জন্য সমস্যাটি শুধু চীন থেকে বিপুল আমদানি নয়। চীনের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশও তুলনামূলকভাবে কঠিন।

বিশেষজ্ঞ কেভিন জংঝে লির মতে, চীনে ভারতীয় পণ্যকে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধার মুখে পড়তে হয়। ফলে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে চীনের বাজারে বড় পরিসরে রফতানি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক উষ্ণতার মধ্যেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুই দেশের মধ্যে ‘কাঠামোগত বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা’ এবং সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের শিল্প অর্থনীতিতে চীনা আমদানি এতটাই গভীরভাবে ঢুকে পড়েছে যে এই নির্ভরতা কমানো সহজ হবে না।

খেলনা শিল্পের সাফল্য কি অন্য খাতে অনুসরণ করা সম্ভব?
খেলনা শিল্পে ভারত যে সাফল্য পেয়েছে, সেটি অন্যান্য খাতেও অনুসরণ করা সম্ভব কি না- এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

দীর্ঘমেয়াদে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ভারতের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে শুধু শুল্ক বাড়ালেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

এর জন্য খাতভিত্তিক শিল্পনীতি, সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ, সহজলভ্য ঋণ, দক্ষ পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা এবং স্থিতিশীল নীতিমালা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে ভারত এখনও নানা সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে।

সম্প্রতি ভারত বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের (এফডিআই) নিয়মও কিছুটা শিথিল করেছে। এর ফলে চীনা কোম্পানিগুলো ভারতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা হলো, এমন বিনিয়োগ যেন শুধু চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ভারতে পণ্য সংযোজন বা বাজারজাতকরণে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় মূল্য সংযোজন, দেশে যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং ভারত থেকে রফতানি বাড়ানোর মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে রফতানি বাড়ানোর বিকল্প
স্বল্পমেয়াদে চীনে নির্দিষ্ট কিছু ভারতীয় পণ্যের রফতানি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ওষুধশিল্প এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় একটি খাত হতে পারে। কারণ চীনের জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে এবং দেশটিতে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও বাড়ছে।

তবে ১১২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্য রফতানি বাড়িয়ে কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন কেভিন জংঝে লি।

তার মতে, মূল প্রশ্ন হলো- দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চীন ভারতীয় পণ্যের জন্য তার বাজার আরও উন্মুক্ত করতে কতটা প্রস্তুত। আর তা না হলে ভারতকে নিজের অর্থনৈতিক শক্তি ও বাজারের গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে চীনের কাছ থেকে বাজারসুবিধা আদায়ের পথ খুঁজতে হবে।

সব মিলিয়ে, খেলনা শিল্পে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর সাফল্য ভারতকে একটি সম্ভাব্য পথ দেখিয়েছে। কিন্তু শিল্প উৎপাদনের গভীরে চীনা কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি-নির্ভর উপকরণের যে বিস্তৃত উপস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা নয়াদিল্লির জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সূত্র: বিবিসি

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..