মুহ. মিজানুর রহমান বাদল, মানিকগঞ্জ:
নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান আইকন ফোর্স নামে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে
বেকারদের চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। এতে
এলাকার বেকার যুবকেরা প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসার
উপক্রম হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে আইকন ফোর্স সিকিউরিটি সার্ভিস
লিমিটেড নামের ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক স্বামী স্ত্রীর বিরুদ্ধে। এর আগেও
ওই প্রতিষ্ঠানটি গাজীপুর ও মানিকগঞ্জে অফিস খুলে বার বার বদল করা হয়।
পরে প্রতারিত ব্যক্তিদের রোষানলে পড়ে সটকে পড়ে। বর্তমানে মানিকগঞ্জের
সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ইউনিয়নের বাস্তা বাসস্ট্যান্ডে একটি অফিস
খোলে শতাধিক বেকারের কাছ থেকে অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে
আত্মসাৎ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইকবাল হোসেন ও তার কথিত
স্ত্রী মায়া খন্দকার। এই প্রতারণার ব্যবসা বন্ধ ও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক
ইকবাল এবং তার সহযোগীদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের প্রতি
জোড় দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
ইকবাল হোসেন ও তার কথিত স্ত্রী মায়া খন্দকারের ভয়াবহ প্রতারনার বিষয়টি
জানাজানি হয় স্কুল শিক্ষার্থী সিফাত হোসেন ও সৌরভ হোসেনের
প্রতারিত হওয়ার ঘটনা থেকে। তারা সাভারের হেমায়েতপুরের সান মুন
ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। পড়শোনার খরচ যোগাতে তারা
খন্ডকালীন চাকুরীর সন্ধান করছিলেন। একদিন তাদের নজর কাড়ে-স্কুলের সামনে
বৈদ্যুতিক খুটিতে সাঁটানো আইকন ফোর্স সিকিউরিটি সার্ভিস
লিমিটেড-এর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির লিফলেটে। তাতে লেখা ছিল: ব্যাংক, অফিস,
এটিএম বুথ, হাসপাতাল, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, অ্যাপার্টমেন্ট ও
গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আকর্ষণীয় বেতনে লোকবল নিয়োগ
দেওয়া হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে জানতে প্রচারপত্রে (লিফলেট) দেওয়া
মোবাইলে নম্বরে যোগাযোগ করে সিফাত ও সৌরভ। লিফলেটে হেমায়েতপুর
বাসস্ট্যান্ডের কথা লেখা থাকলেও ফোনে তাদেরকে জানানো হয় সিংগাইর-
হেমায়েতপুর আঞ্চলিক সড়কের বাস্তা বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইল মঞ্জিলে
প্রতিষ্ঠানটির অফিসে যোগাযোগ করার জন্য। দুই বন্ধু সেখানে গেলে
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন একই অফিসে কর্মরত তার
কথিত স্ত্রী মায়া খন্দকারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। মায়া তাদেরকে
জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে খন্ডকালীন চাকরির সুযোগ আছে। মায়ার কথার
জালে পড়ে সিফাত ও সৌরভ চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখান।
চাকরিতে যোগদানের আগে তাদের কাছ থেকে ড্রেস, আইডি কার্ড ও
পুলিশ ভেরিফিকেশনের ফির নামে আদায় করা হয় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। এ
অর্থ দেওয়ার পর অফিসের পিয়ন পদে ১০ হাজার টাকা মাসিক বেতনে গত
অক্টোবরের শুরু থেকে চাকরিতে যোগ দেন তারা। পিয়ন পদে চাকরি হলেও
দুজনকে প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রচারপত্র বিতরণ ও পোস্টার
সাঁটানোর কাজ দেওয়া হয়। নিয়োগ বিজ্ঞাপ্তিতে যেসব সুযোগ-
সুবিধার কথা বলা হয়, কাজে যোগ দেওয়ার পর তা তাদের দেওয়া হয়নি। মাস
শেষে বেতন চাইলে তাদের কাউকেই তা পরিশোধ করা হয়নি। বেতন ও অন্যান্য
সুবিধা না পেয়ে সিফাত ও সৌরভ বুঝতে পারেন তাঁরা প্রতারনার ফাঁদে
পড়েছেন। টানা দেড় মাস কাজ করার পর বেতন-ভাতা না পেয়ে তারা চাকুরি
ছাড়েন। পরে কয়েক দফা অফিসে গিয়ে বেতনের জন্য তাগাদা দিলেও ফল হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইকবাল ও তার সহযোগি মায়াকে বহুবার ফোন করেন
তারা। তার মধ্যে মায়া একবার ফোন ধরে তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কল কেটে দেন।
শুধু সিফাত ও সৌরভই নন, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ প্রতিষ্ঠানের
প্রচারপত্রে বিভিন্ন সুবিধাসহ চাকরির প্রলোভনে পড়ে এ বছরই প্রতারণার
শিকার হন শতাধিক চাকরিপ্রার্থী। তাদের কাছ থেকে অর্ধ কোটি টাকা
অর্থ হাতিয়ে নেন ইকবাল ও তার কথিত স্ত্রী মায়া।
প্রতারিতদের মধ্যে রয়েছে পাবনার ফরিদপুর উপজেলার রামনগরের আব্দুর সাত্তার
মোল্লার ছেলে জাকির হোসেন, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার
বেড়াখোলা গ্রামের মৃত কালা মিয়ার ছেলে আলী রাজ ও জয়পুরহাটের আক্কেলপুর
উপজেলার উত্তর রামছাড়ার হোসাইন আলী। এছাড়াও প্রতারিত হন নওগাঁর
চাঁন মিয়া, উত্তরবঙ্গের ইয়াসমিন, খুলনার বর্ষা, টাঙ্গাইলের আতোয়ার
রহমান, ঢাকার গাবতলীর মো: জুয়েল ও সিংগাইর উপজেলার দক্ষিন ধল্লা
গ্রামের মোহনা, সাভারের নবীনগরের আফজাল হোসেন, হেমায়েতপুরের মীম
আক্তার, ফারুক হোসেন, জিয়াসমিন, লিওন, মমিনুল ইসলাম, রবিন, সুমী
আক্তার, হালিমা আক্তার। এদের ছাড়াও প্রতারিত হন পাপিয়া, মোহনা, রুবেল,
শরিফুল ইসলাম, তোতা, জিল্লুর রহমান ও আশরাফসহ বহু বেকার তরুণ-তরুণী।
প্রতারিতরা জানান, তাঁদের কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নামে জামানত ও
ইউনিফর্ম বাবদ ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ইকবাল ও
মায়া। বেশির ভাগই এক-দুই মাস চাকরি করেছেন। তবে তাদের বেতন-ভাতা
দেওয়া হয়নি। কেউ পাওনা টাকার জন্য বার বার তাগাদা দিলে তাকে মারধর ও
ভয়ভীতি দেখিয়ে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের একজন
জাকির হোসেন বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে সুপারভাইজার
পদে চাকরির জন্য আবেদন করি। ৩০ হাজার টাকা বেতনে সুপারভাইজার পদে
চাকরির জন্য ২০ হাজার টাকা জামানত ও ইউনিফর্ম বাবদ তিন হাজার ৫০০
টাকা দেই। এক সপ্তাহ অফিসে গেলেও কাজ দেওয়া হয়নি। প্রতারণার বিষয়টি
বুঝতে পেরে জামানত ও ইউনিফর্ম বাবদ দেওয়া অর্থ ফেরত চাই। তখন
প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ইকবাল আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন ও ভয়ভীতি
দেখান। উপায় না পেয়ে ঝগড়াঝাটি করে সেখান থেকে চলে আসি। এরপর
তিন মাস অতিবাহিত হলেও তারা আমার পাওনা টাকা ফেরত দেয়নি।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতারক চক্রের মুলহোতা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক
ইকবাল ও তার কথিত স্ত্রী মায়া খন্দকার।ইকবাল হোসেনের বাড়ি মানিকগঞ্জ
সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের উকিয়ারা গ্রামে। তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে
চলতি বছরের শুরুতে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বাস্তা বাসস্ট্যান্ডের
কাছে ইসমাইল মঞ্জিলের আন্ডারগ্রাউন্ডে অফিস ভাড়া নেন। এরপর থেকে
চাকরি দেওয়ার নামে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বেকার তরুন-
তরুনীদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এর আগে ২০১৮ সালে মানিকগঞ্জ পৌর
শহরের উত্তর সেওতা এলাকায় ভাড়া বাড়িতে অফিস খোলে ছিলেন তারা। একই
কায়দায় চাকরিপ্রার্থী বেকারদের কাছ থেকে প্রতারনার মাধ্যমে হাতিয়ে
নেন মোটা অংকের অর্থ। বিষয়টি জানাজানি হলে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন স্থানীয়
লোকজন ও ভুক্তভোগীরা। জনরোষ এড়াতে ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে রাতের
আঁধারে অফিস গুটিয়ে গাঢাকা দেন ইকবাল। ওই বছরই তিনি গাজীপুরের
কালিয়াকৈর উপজেলার বারইপাড়ায় অফিস নিয়ে আবার প্রতারণার ফাঁদ
পাতেন। স্থানীয় লোকজন ও প্রতারিতদের রোষানলে পড়ে গত জানুয়ারিতে
অফিস গুটিয়ে সেখান থেকেও পালান ইকবাল ও তার সহযোগিরা। পরে চলতি
বছরের শুরুতে মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার বাস্তা বাসস্ট্যান্ডের
কাছে ইসমাইল মঞ্জিলের আন্ডারগ্রাউন্ডে অফিস ভাড়া নিয়ে আবার নতুন
করে প্রতারণার ব্যবসা শুরু করেন। ইকবালের বিরুদ্ধে নারী চাকরিপ্রার্থীদের
যৌন হেনস্তার অভিযোগ ও রয়েছে। আইকন ফোর্স সিকিউরিটি
সার্ভিসের সাবেক মার্কেটিং ম্যানেজার রফিকুল আলম লাভুর কাছে জানতে
চাইলে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সম্পুর্ণ ভুয়া। কোনো কাগজপত্র নেই।
পরিচালক ইকবাল হোসেন প্রতারক। ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে
চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে জামানত, ফরম ও ইউনিফর্ম বাবদ অর্থ আদায়
করে তা আত্মসাৎ করেন। আমিও এভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছি। প্রতারণার
বিষয়টি বুঝতে পেরে চার মাস আগে চাকরি ছেড়েছি। এখনো আমি
প্রতিষ্ঠানটির কাছে বেতনের ৯৬ হাজার টাকা পাবো। আমার কাছে ২৫-৩০
ভুক্তভোগীর তথ্য আছে। তাদের সবার কাছ থেকে জামানত, ইউনিফর্ম ও অন্যান্য
বাবদ ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ইকবাল ও মায়া। এছাড়া
অনেকের এক থেকে তিন মাসের বেতন পাওনা রয়েছে। কেউ টাকা চাইলেই
তারা ভয়ভীতি দেখান।
স্থানীয় বাসিন্দা রমজান আলী জানান, আইকন ফোর্স সিকিউরিটি
সার্ভিসের পরিচালক ইকবাল হোসেনের প্রতারণার শিকার হয়ে আমার কাছে
অনেক ভুক্তভোগী এসেছিলেন। আমি একজনের পাওনা টাকা আদায় করে
দিয়েছি। প্রতিদিনই টাকার জন্য ভুক্তভোগীরা অফিসে এসে ঘুরাঘুরি করে।
পাওনা টাকা চাইলে হুমকিধামকি দিয়ে অফিস থেকে বের করে দেন ইকবাল।
এই প্রতারকদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তা না হলে আরো বহু
সহজ-সরল মানুষ তাঁদের প্রতারণা ফাঁদে পড়বেন।
সদ্য বিদায়ী সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কামরুল
হাসান সোহাগ জানান, এ বিষয়ে এখনো কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ
করেননি। খোঁজখবর নিয়ে প্রতারণার সত্যতা সাপেক্ষে আইকন ফোর্স
সিকিউরিটি সার্ভিস ও তার পরিচালক ইকবাল হোসেনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে
আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে আইকন ফোর্স সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেডের পরিচালক
মো: ইকবাল হোসেন সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা বিভিন্ন
শিল্প ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বেকার তরুণ-তরুণীদের চাকরির ব্যবস্থা করে দেই।
সেখান থেকে আমরা নির্দিষ্ট কমিশন বাবদ টাকা পাই। এর বাইরে চাকুরী
প্রার্থীদের কাছ থেকে জামানত ও ইউনিফর্মের জন্য কিছু টাকা নেওয়া
হয়। অনেক দুষ্টু লোক কাজ ভাল না লাগায় চাকরি ছেড়ে প্রতিষ্ঠানের নামে
মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা বলছে। এরপরও যদি কেউ টাকা-পয়সা পান তাহলে দিয়ে
দিব। প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চাইলে
মানিকগঞ্জ পৌর শহরের অফিসের ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট
দেখান। তাও আবার মেয়াদ উত্তীর্ণ। কিন্তু বাস্তা বাসস্ট্যান্ডের অফিসের
কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তিনি।
Leave a Reply