অর্থ-বাণিজ্য
পেঁয়াজের বাজারে বছরের পর বছর ধরে এক ধরনের অস্থিরতা চলে আসছে। প্রতিবেশী দেশ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে দেশে দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে। আবার খুলে দিলে কমছেও একই অস্বাভাবিক গতিতে। দাম কমলে লোকসান গোনেন দেশের কৃষক। বাড়লে পকেট ফাঁকা হয় ভোক্তাদের। মাঝখান থেকে ফায়দা লুটছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
পেঁয়াজের বাজারে অনিশ্চয়তার এই চিত্র পাল্টে দিতে পারে চাহিদার শতভাগ দেশীয় উৎপাদন। আর সেই আশাই দেখাচ্ছেন দেশের চাষিরা। লোকসানের শঙ্কা কাটিয়ে পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়িয়েছেন তাঁরা। প্রতিবছর নিয়ম করে ৩ থেকে ৪ শতাংশ বাড়লেও গত বছর উৎপাদন বেড়েছে ৮ শতাংশের বেশি। এর পরিমাণ দেড় লাখ টনের ওপরে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের বাজারে পেঁয়াজের ভালো দাম দেখে আশান্বিত হয়ে বাড়তি উৎপাদনে ঝুঁকেছেন কৃষকরা। সে সুবাদে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে হলে পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে আমদানি বন্ধ রাখতে হবে। অন্যথায় লোকসানে পড়ে পেঁয়াজ আবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন দেশের কৃষকরা।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে ২৫ লাখ টন। দেশীয় উৎপাদন থেকে এর পুরোটা পূরণ হয় না। প্রতিবছর যা উৎপাদন হয় তা থেকে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময় নষ্ট হয় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ। ঘাটতির বেশির ভাগ পূরণ হয় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আমদানি করে। মিয়ানমার থেকেও কিছু পরিমাণ আমদানি হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত বছর (২০১৯-২০) দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে ১৯ লাখ ৫৩ হাজার টন। এটা আগের বছরের তুলনায় এক লাখ ৫০ হাজার টন বেশি। আগের বছর (২০১৮-১৯) সালে উৎপাদন ছিল ১৮ লাখ দুই হাজার টন। সে হিসাবে এক বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে ৮.৩২ শতাংশ। তার আগের বছর পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছিল ৬৫ হাজার ১৫৪ টন বা ৩.৭৩ শতাংশ। দেশে ২০১৭-১৮ সালে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল ১৭ লাখ ৩৭ হাজার টন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সম্প্রতি ১৪টি কৃষি পণ্যের উৎপাদন খরচ চূড়ান্ত করেছে। এতে দেখা যায়, চলতি মৌসুমে কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৯ টাকা ১৪ পয়সা। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ইউসুফ জানান, এই খরচ হিসাবে ধরে খুচরা পর্যায়ে পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা কেজি বিক্রি হলেও কৃষকের লাভ থাকবে। বাজারে বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ ৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। গত বছরও পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৯ টাকার আশপাশেই ছিল।
কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। কয়েক বছরের মধ্যেই দেশ পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে আশা করা যায়। কেননা আমরা এত দিন শুধু শীতকালীন পেঁয়াজের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখন গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বেশ কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করে চাষিদের দেওয়া হয়েছে। এতে পেঁয়াজের উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে ব্যয় হয় ১৫ টাকা। চাষিরা তা বিক্রি করেন ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজি। আর ভোক্তাপর্যায়ে বাজারে তা বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তা ১০০ টাকা অতিক্রম করে যায়। ২০২০ সালে জেলাভেদে প্রতি কেজি পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ পড়েছে ১৮ থেকে ২০ টাকা। ওই বছরও পেঁয়াজের দাম ছিল ৫০ থেকে ১০০ টাকা কেজি।
জানা যায়, ভারত নিজেদের বাজার সামাল দিতে গত দুই বছর সেপ্টেম্বর মাস এলেই পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে ২০১৯ সালে দেশে পেঁয়াজের কেজি ২৫০ টাকায় উঠে যায়। সদ্যোবিদায়ি দেশের বাজারে সেঞ্চুরি হাঁকায় পেঁয়াজ। বাধ্য হয়ে বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে সরকার। এখন দেশে পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে ভারত রপ্তানি বাজার খুলে দিয়েছে। এতে দাম নেমে এসেছে ৪০ টাকা কেজির মধ্যে।
দেশে আমদানিনির্ভরতা কমাতে ও কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত অর্থবছরই পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক আরোপের কথা বলেছিল। সেই প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে দুই দফায় মোট ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পেঁয়াজ আমদানিতে এত দিন শূন্য শুল্ক থাকায় কৃষকরা এত দিন ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত থেকেছেন। শুল্ক আরোপের এই পদক্ষেপ কিছুটা হলেও পেঁয়াজ আমদানিকে নিরুৎসাহ করবে। আর এতে দেশের কৃষকরা এক ধরনের সুরক্ষা পাবেন। তবে শুধু শুল্ক আরোপই দেশের কৃষকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ গত বছর ফেব্রুয়ারিতে যখন ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির বাজার খুলে দেয়, তখন দেশে আমদানি হয়েছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি। এ বছরও ওই দামে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি করলে ১০ শতাংশ হারে কেজিপ্রতি শুল্ক দিতে হবে দুই টাকারও কম। এতে দেশীয় চাষিদের লোকসানের শঙ্কা থেকেই যায়। তাই পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন না দেওয়ার দাবি কৃষকদের।
গত বৃহস্পতিবার পাবনার সুজানগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবাদ শেষে পেঁয়াজ ঘরে তোলার পর প্রথম দিকে তাঁরা ভালোই দাম পেয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে আসার পর থেকে দেশি মূল কাটা পেঁয়াজের দাম পড়তে থাকে। গোপালপুর গ্রামের কৃষক বিল্লাল হোসেন জানান, এক বিঘা জমিতে আগাম পেঁয়াজ আবাদ করতে তাঁর উৎপাদন খরচ হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় উৎপাদিত হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ মণ। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদিত পেঁয়াজের মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৪০ হাজার টাকা, যা উৎপাদন খরচের চেয়ে ২০ হাজার টাকা কম। অথচ ১০ থেকে ১৫ দিন আগেও প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। চরবিশ্বনাথপুর গ্রামের কৃষক আক্কাছ আলী বলেন, ‘ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে চলে আসায় দাম পড়ে গেছে। এ জন্য আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
রাজবাড়ী জেলাজুড়ে এবার তুলনামূলক বেশি পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। এখানকার কৃষক সাদেক মণ্ডল, কামাল মিয়া ও আব্দুর রহমান বলেন, বিগত মৌসুমে পেঁয়াজের বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী থাকায় তাঁরা লাভবান হয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায়ই এবার জেলায় পুরোদমে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ থেকে দেদার পেঁয়াজ আমদানি হওয়ায় তাঁদের লোকসানে পড়তে হচ্ছে।
Leave a Reply