নিজস্ব প্রতিবেদক:
যশোর-নড়াইল সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গ্রেফতার আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য নদী আক্তার ইতি ওরফে জয়া আক্তার জান্নাত ওরফে নূরজাহান সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। দুর্ধর্ষ নদী নারী পাচারের জন্য ১০টি নাম ব্যবহার করতো। তিন দেশে (ভারত, মালয়েশিয়া ও দুবাই) নারী পাচার করাই ছিল তার লক্ষ্য। পাচারের কৌশলের অংশ হিসেবে স্থানভেদে একেক নাম ব্যবহার করতা সে।
গত সোমবার নদী আক্তার ইতিসহ আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
গ্রেফতারকৃতরা হলো- আল আমিন হোসেন (২৮), সাইফুল ইসলাম (২৮), আমিরুল ইসলাম (৩০), পলক মন্ডল (২৬), তরিকুল ইসলাম (২৬) ও বিনাশ শিকদার (৩৩)।
মঙ্গলবার রাজধানীর নিজ কার্যালয়ে এসব কথা বলেন তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ।
মো. শহিদুল্লাহ বলেন, পাচারের উদ্দেশ্যে আনা মেয়েদের যশোর সীমান্তে বিভিন্ন বাড়িতে রাখতো চক্রটি। সেখান থেকে সুযোগমতো ভারতে পাচার করা হতো। পাচারকৃত প্রত্যেক মেয়ের জন্য স্থানীয় এক ইউপি সদস্য (মেম্বার) এক হাজার টাকা করে নেয়। পাচারকালে কোনো মেয়ে বিজিবির কাছে আটক হলে সেই ইউপি সদস্য তাকে আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আসতো।
তিনি আরো বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী রাজীব হোসেনের সঙ্গে ২০০৫ সালে নদীর বিয়ে হয়। ২০১৫ সালে রাজীব বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলে নদী আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। পাচারকরা ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নদীর ১০টি নাম পাওয়া গেছে। নদী ভারত, মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ের নারী পাচার চক্রের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করতো।
তিনি আরো বলেন, পাচারকৃত নারীদের কাছে নদী হিসেবে পরিচয় দিলেও ভারতে ইতি নামে সবাই চেনে। ভারতীয় আধার কার্ডে জয়া আক্তার জান্নাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশি পাসপোর্টে তার নাম নুরজাহান। সাতক্ষীরা সীমান্তে তার নাম জলি, যশোর সীমান্তে প্রীতি নামে পরিচিত।
ডিসি তেজগাঁও বলেন, গ্রেফতার আল আমিন হোসেন ২০২০ সালে ঈদ উল আজহার চারদিন পর নারী পাচার করতে গিয়ে বিএসএফ হাতে গুলিবিদ্ধ হয়। পাচারের উদ্দেশ্যে আনা মেয়েদের তার বাড়িতে রেখে সুযোগ মতো ভারতে পাঠানো হতো। সে নারী পাচার ও মাদক ব্যবসায় জড়িত। তার নামে যশোরের শার্শা থানায় দুটি মাদক মামলা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, গ্রেফতার সাইফুল ইসলামের শর্শার পাঁচভুলট বাজারে মোবাইল রিচার্জ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা আছে। মানবপাচারে জড়িত ইস্রাফিল হোসেন খোকন, আব্দুল হাই, সবুজ, আল আমিন ও একজন ইউপি সদস্য তার মাধ্যমে মানবপাচার থেকে অর্জিত অর্থ বিকাশে লেনদেন করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেলে সে মানবপাচারে জড়িত ব্যক্তিদের সতর্ক করে। বিকাশ ট্রানজেকশনে ব্যবহৃত মোবাইলটি উদ্ধারও করা হয়েছে।
পুলিশের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গ্রেফতার পলক মন্ডল যশোরের মনিরামপুর ঢাকুরিয়া স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার গাহঘাটা থানার নলকড়া গ্রামে নানা বাড়িতে যায়। সেখানে পঞ্চগ্রাম স্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়ে মাধ্যমিক পাস করে। পরে ব্যাচলর অব আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি( BAMS) ডিগ্রি নিয়ে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শুরু করে। বেনাপোলের ইস্রাফিল হোসেন খোকন, ভারতে অবস্থানকারী বকুল ওরফে খোকন, তাসলিমা ওরফে বিউটি ও চক্রের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা নিতে আসা গ্রাম্য দরিদ্র মেয়েদের ব্যাঙ্গালুরুতে তাসলিমা ওরফে বিউটি নামে একজনের কাছে পাঠানোর মাধ্যমে নারী পাচার শুরু করে সে। পরে বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত মেয়েদের আধার কার্ড প্রস্তুত করে দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ ‘সেফ হোম’ এ অবস্থান এবং ব্যাঙ্গালুরে নির্ধারিত স্থানে পাঠানোর দায়িত্ব নেয় পলক মন্ডল।
মো. শহিদুল্লাহ বলেন, এছাড়া পলক মন্ডল ভারতীয় আধার কার্ড ও ভারতের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত আইডি কার্ডধারী। সে উত্তর প্রদেশের গোরাক্ষপুর জেলার বড়ালগঞ্জ থানার নেওয়াদা গ্রামেও বসবাস করেছে। তার কাছ থেকে তার ভারতীয় আধার কার্ড, সেদেশের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া আইডি কার্ড, ভারতীয় আয়কর বিভাগ দেওয়া আইডি কার্ড, ভারতীয় সিম কার্ড ও একজন ভিকটিমের আধার কার্ড জব্দ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রেফতার বিনাশ সিকদার নড়াইলের শিক্ষাগত যোগ্যতা দশম শ্রেণি পর্যন্ত। সে বেনাপোলে বাসা ভাড়া নিয়ে পাসপোর্ট ফরম পূরণের কাজ করে। তার স্ত্রী সোনালী সিকদার ভারতীয় নাগরিক। বেনাপোলে পাসপোর্ট ফরম পূরণের কাজ করতে গিয়ে ইস্রাফিল হোসেন খোকন, আব্দুল হাই সবুজ ও মানবপাচারে জড়িত আরো কয়েকজনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়।
তিনি আরো বলেন, সেই পরিচয়ের সূত্রধরে মানবপাচারের জড়িয়ে পড়ে। যশোর ও নড়াইল থেকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে মোটা বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আনা নারীদের ইস্রাফিল হোসেন খোকন, আল আমিন, তরিকুল, আমিরুল ও আরো কয়েকজনের মাধ্যমে সীমান্ত পার করে ভারতীয় দালালদের কাছে পৌঁছে দেয় সে। তার কাছ থেকে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও দুটি মোবাইল উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেফতাররা ভারতীয় পরিচয়পত্র কিভাবে তৈরি করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতীয় লোকেদের সাহায্যে এগুলো তৈরি হয়েছে। এছাড়া কতজনকে ভারতে পাচার করা হয়েছে তা জানতে সাতজনকে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করা হবে।
Leave a Reply