যুগ যুগান্তর
একপক্ষ যেখানে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে অনেকেই তাকে একজন সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল অফিসার হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
দীন মোহাম্মদকে ঘিরে বিতর্ক ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া: অভিযোগের বিপরীতে উঠে এলো মানবিক ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার চিত্র
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) শাহমখদুম জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) দীন মোহাম্মদকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রবাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুর রব ভুট্টো এক ফেসবুক পোস্টে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করলে পোস্টটির নিচে অসংখ্য ব্যক্তি মন্তব্য করে এসব অভিযোগের বিরোধিতা করেন এবং দীন মোহাম্মদের পক্ষে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
মেধা, সংগ্রাম ও চাকরি জীবনের শুরু
দীন মোহাম্মদের কর্মজীবনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি নোয়াখালীর সেনবাগের একটি শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৯৬ সালে কানকির হাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি এবং ১৯৯৮ সালে নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক এবং ফলিত গণিতে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
২৮তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর একটি মামলার কারণে চাকরিতে যোগদান বিলম্বিত হয়। পরবর্তীতে আদালতে অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে তিনি ২০১১ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন।
রাজশাহীর সারদায় প্রশিক্ষণকালেই তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ল অ্যান্ড জাস্টিস’ বিভাগে এমপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
দীর্ঘ সাত বছরের বিভাগীয় তদন্ত
পুলিশের বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, কর্মজীবনের শুরুতেই তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। অভিযোগগুলো ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনবার তদন্ত করা হয়।
অবশেষে সব তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তার চাকরি স্থায়ী করা হয়। সমর্থকদের দাবি, যখন একই ব্যাচের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পাচ্ছিলেন, তখন তিনি দীর্ঘ সময় প্রশাসনিক জটিলতা ও তদন্তের মধ্যে ছিলেন।
তাদের প্রশ্ন—যদি তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাভোগী হতেন, তাহলে কেন তাকে বছরের পর বছর তদন্ত ও পদোন্নতি বঞ্চনার মুখোমুখি হতে হতো?
আব্দুর রব ভুট্টোর অভিযোগ
আব্দুর রব ভুট্টো তার পোস্টে দাবি করেন, দীন মোহাম্মদ ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিগত সরকারের সময়ে সুবিধা পেয়েছেন।
এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দীন মোহাম্মদের ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন এবং তার সম্পদের বিষয়েও অনুসন্ধান হওয়া উচিত।
তবে পোস্টটিতে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি, আদালতের রায়, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা সরকারি তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।
পাল্টা বক্তব্য: “জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন”
সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হচ্ছে জুলাই আন্দোলন ঘিরে বিভিন্ন ব্যক্তির মন্তব্য।
মন্তব্যকারী আরাফাত হোসেন বলেন,
“জুলাই আন্দোলনের সময় দ্বীন মোহাম্মদ ভাই আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। আন্দোলন-পরবর্তী সময়েও বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন। কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়েছে, তিনি সত্যিই একজন ভালো মানুষ।”
আব্দুল্লাহ আল নাদিম লিখেছেন,
“ওয়ারী জোনে দায়িত্ব পালনকাল থেকে তাকে চিনি। ফেনীতেও দেখেছি। জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিকতারও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব অনেকের কাছে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।”
“প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়”
মন্তব্যকারী ইখতিয়ার হোসেন অভিযোগগুলোর তথ্যভিত্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তার ভাষায়,
“ডিএমপি, ফেনী, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করা একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্বাভাবিক কর্মজীবনের অংশ। কোনো এলাকায় কর্মরত ছিলেন বলেই সব রাজনৈতিক ঘটনার দায় তার ওপর চাপানো যায় না। অবৈধ সম্পদ বা অন্য অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, রাজশাহীতে দায়িত্ব পালনকালে দীন মোহাম্মদ সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং বহু মানুষ তার মানবিক আচরণের সাক্ষী।
“শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন”
জুলাই আন্দোলনের সময় ফেনীতে অবস্থানকারী একাধিক ব্যক্তি একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।
যোবায়ের বিন ওবায়েদ মন্তব্য করেন,
“তিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং বিভিন্নভাবে আন্দোলনকে সহযোগিতা করেছিলেন। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বও পালন করেছেন।”
মোমিন হোসাইন পাটোয়ারী লিখেছেন,
“জুলাই আন্দোলনের সময় দ্বীন মোহাম্মদ স্যার ফেনীতেই ছিলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।”
জাহিদুল ইসলাম পলাশও একই ধরনের মন্তব্য করে বলেন, তিনি আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করেছেন।
“পুলিশ কর্মকর্তা হলেও ছিলেন সহজ-সরল”