সুনামগঞ্জসংবাদদাতা
হাওরে ৬০টি স্থানে ড্রেনেজ আউটলেট স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এ প্রকল্পে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ কোটি টাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা বলেন, ‘হাওর রক্ষা বাঁধ’ দিয়ে পাহাড়ি ঢল ও বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা করা গেলেও হাওরে নতুন সমস্যা অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা থেকে ফসল রক্ষা করা এখন মুশকিল। হাওরের চতুর্দিকে বাঁধ থাকায় বাহির থেকে হয়তো পানি না ঢুকলেও জমে থাকা বৃষ্টির পানি বের হওয়ার কোনো পথ থাকে না। তাই এবার সিলেটের চার জেলায় ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। কৃষি বিভাগ জানায়, ৯৯৭ কোটি ৮২ লাখ ৮২ হাজার ৮২ হাজার ২০১ টাকা ও ১ লাখ ৭০ হাজার ১৫২ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। জলবায়ুর প্রভাবে হাওরে নতুনভাবে আবির্ভূত এই সমস্যা মোকাবিলায় ‘ড্রেনেজ আউটলেট’ স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
এ বছর এপ্রিল ও মে মাসের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে কৃষকদের যে সর্বনাশ ঘটে, তা এলাকাবাসী, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। ‘যে কোনো মূল্যে ফসল রক্ষা করে মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে। তাই ফসল রক্ষার জন্য ড্রেনেজ ‘আউটলেট’ স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন,’ বলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাইসার আলম। তিনি বলেন, ‘সুনামগঞ্জের হাওরে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য আপাতত ৬০টি স্থানে ‘ড্রেনেজ আউটলেট’ ও হাওর রক্ষা বাঁধেও ‘আরমারিং’ (ব্লক দিয়ে ডেকে দেওয়া) জরুরি।’ তিনি জানান, এবার সুনামগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধের ২৬টি স্থান কেটে জমে থাকা পানি বের করতে হয়। একপর্যায়ে তিন দিনে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত ঘটে নদীর পানি হাওরের ওপরে উঠে যায়। তাই শেষ রক্ষা হয়নি। প্রকৌশলীরা জানান, প্রকল্পটির ডিজাইন করা হচ্ছে। অনুমোদনের পর এবং শুষ্ক মৌসুমে কাজ শুরু হবে।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকটাই কৃষিনির্ভর। বিশেষ করে এক ফসলি বোরো ধান এই অঞ্চলের প্রধান ফসল। খুব কম জমিতে আমন, আউশ ও অন্যান্য ফসল উৎপাদিত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগে থাকে। খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সিলেটে পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টিতে এ অঞ্চলের অবকাঠামো বিনিষ্ট হওয়া ছাড়াও নদীভাঙন, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থানসহ নানা দিকে অধিবাসীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকেও বছর বছর বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়। এই অবস্থায় খাদ্যনিরাপত্তায় ঝুঁকি বাড়ছে। আর্থ-সামাজিক অবস্থারও অবনতি হচ্ছে। অনেকেই কৃষি পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। হাওর, নদী, খাল ভরাট, নদী ভাঙনে হাওরপাড়ের মানুষ অতিষ্ঠ।
নদী ও খাল পুনঃখনন প্রকল্প :২০১৭ সালে সিলেটে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর নদী খননসহ এই অঞ্চলের অবকাঠামো রক্ষায় বেশ তোড়জোড় শুরু হয়। নদী খননেরও সমীক্ষা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। তবে এবার কৃষকের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবনমান রক্ষায় বড় পরিসরের নদী ও খাল পুনঃখনন প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪২৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। বোরো মৌসুমে আকস্মিক বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা হবে এই প্রকল্পে। প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৩০ হেক্টর কৃষিজমি সুরক্ষার আওতায় আনা হবে।
হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদনের আগে কারিগরি দিক যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০২৯ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলার সুনামগঞ্জ সদর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, শান্তিগঞ্জ, জগন্নাথপুর, দিরাই শাল্লা উপজেলা। এছাড়া ময়মনসিংহ জেলার খালিয়াজুড়ি এবং কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা, মিঠামইন, নিকলি, বাজিতপুর ও ভৈরব উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।
প্রকল্পের আওতায় হাওর এলাকায় ১৩টি নদীর প্রায় ৩০৩ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার অংশে ড্রেজিং, প্রায় ১২ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, সিসি ব্লক আর্মারিং ৩ কিলোমিটার, ফ্লাড ফিউজ নির্মাণ ১২টি এবং একটি অনাবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটির উদ্দেশে বলা হয়েছে : নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, আগাম বন্যা থেকে বোরো ধান রক্ষা করা, নৌ-চলাচল সহজ করা। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটানো। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিকটন বোরো ধান আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে, কৃষকদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।