ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
বছর ঘুরে চলে এসেছে বর্ষা, বইছে সুবাতাস। তাই বর্ষার আগমনে নৌকার কারিগররা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। বছরের অন্য মাসগুলো যেমনই কাটুক, বর্ষার অপেক্ষায় তারা অধির আগ্রহে বসে থাকেন।
বর্ষায় ব্যাপারীরা তাদের মৌসুমী ব্যবসার জন্য নৌকা তৈরির জন্য মাথাকাঠ, বাইমা গুড়া, চাড়া, দারত, থুতি, বাহা, পাঠাতন, মাছাইল এবং তলি (নিচের অংশ) কাঠ ক্রয় করে মজুদ করে থাকেন।
নৌকা তৈরির যন্ত্রপাতি হাতুরি, বাডাল, করাত, বর্মা (কাঠ ছিদ্র করার যন্ত্র) মাডাম, টেইপ, ডাইবার, বেনা, রামদা, খল, বাইস, বরদু, কাওলাল ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার যন্ত্রপাতি নিয়ে তৈরি থাকেন কারিগররা। তারা ব্যস্ত সময় পার করলেও বর্ষার পানি কম থাকায় এক ধরনের শঙ্কা, হতাশা ও বিপাকে রয়েছেন।
এক সময় বিশাল নৌকার হাট বসতো ভৈরবের আকবর নগর ও শিমুলকান্দি বাজার ও কুলিয়ারচরের ছয়সতি বাসষ্ট্যান্ড বাজারে। যা সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত চলতো।
কুলিয়ারচরের ছয়ছতির গ্রামের নৌকার ব্যাপারী ইছব মিয়ার ছেলে মো. মানিক মিয়া বলেন, ‘এখন আর আাগের মতো এতো জমজমাট হয় না। আগে ১০ হাত একটা নৌকা বিক্রি করতাম ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা। আর ১২ হাত একটা নৌকা বিক্রি করতাম ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকায়। তারপরও আমাদের লাভ হতো। আর এখন সেই একই মাপের নৌকা বিক্রি করতে হয় সাড়ে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় তার পরও লাভ করা কঠিন হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, আগে কাঠ দাম ছিল কম এবং কারিগরের মজুরি ছিল মাত্র ২০০ টাকা। আর এখন মালের দাম এবং মজুরি বেড়েছে। তা ছাড়া ক্রেতা কমার কারণে বিচা-বিক্রি কম। এখন বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা এবং হাউজিং কোম্পানি বালু ভরাট করার ফলে অনেক জায়গায় পানি না থাকার কারণে এখন আর নৌকার প্রয়োজন হয় না। তাই ক্রেতাও অনেক কমে গেছে।
শিমুলকান্দি এলাকার আনোয়ার মিস্ত্রি বলেন, অনেক বছর ধরে এই পেশায় নিয়োজিত আছি। তবে এখন আর আগের মতো চলে না। শুধু বর্ষায় এই কাজ করি। আর বাকি সময় অন্য কাজ করি। এখন দেখি বর্ষাতেও ঠিকমত পানি আসে না।
ছাগাইয়া এলাকার বিজয় মিস্ত্রীর ছেলে দিলিপ মিস্ত্রী বলেন, আগে বর্ষা আসলে একমাত্র চলার যান ছিল নৌকা। তখন নৌকার চাহিদাও ছিল প্রচুর। এখন এ সব এলাকায় ইঞ্জিন চালিত ট্রলার চলাচল করায় অনেকাংশেই নৌকার চাহিদা কমে গেছে। এছাড়া রাস্তাঘাটও ভালো তাই নৌকার কাজও লাগে কম। তবুও ভরা বর্ষায় কিছু লাভের আশায় আবার ফিরে আসি সেই পুরনো ব্যবসায় । কিন্তু এ বছর আষাঢ় মাস পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এখনও পানির দেখা নেই। পানি না বাড়লে নৌকা নিয়ে মানুষ কি করবে।
আকবর নগর এলাকার হাজী আব্দুল হাই, দেলোয়ার, গিয়াসদ্দীন বলেন, আগে নৌকার হাটের যে কদর ছিল সে তুলনায় এখন নেই বললেই চলে। তবে বর্ষার ভরা মৌসুমে কিছু পাইকারী ব্যবসায়ী এবং খুচরা ক্রেতা আসার কারণে এই শিল্প এখনও কিছুটা হলেও টিকে আছে। তবে বর্ষা যদি বন্যায় রুপ নেয় তখন নৌকার কদর বাড়বে।
নৌকার মধ্যে রয়েছে ডিঙ্গি নৌকা, গয়না নৌকা এবং কোষা নৌকা। তবে মাঝে মধ্যে বাইসের নৌকাও বাজারে দেখা যায়। বর্ষা মৌসুমে গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষের অন্য কোনো কাজ না থাকায় তারা নদী-খালসহ প্লাবন ভূমি থেকে মাছ শিকারসহ যাতায়াতের বাহন হিসেবে কাজ করে এই নৌকা। আর এ জন্য নৌকার প্রয়োজন হয়।
Leave a Reply