সম্পাদকীয়
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে পুলিশি ভাষ্য জানা গেছে। এ ব্যাপারে জানতে আগ্রহী প্রত্যেক মানুষই ইতিমধ্যে পুলিশি বয়ান শুনেছেন। একজন কেবলই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া তরুণ ও দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর মিলে কুমিল্লায় একটি শিশুকে যেভাবে হত্যা করেছে, তা নানা রকম প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়গুলো নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে।
একটি শিশুকে স্রেফ মোবাইল ফোনের জন্য মেরে ফেলতে পারে তারই চেনা লোকজন, এ কথা বিস্ময়ের জন্ম দিলেও অনেকেই বুঝতে পারেন, সমাজ এখন এ রকমই অসহায় হয়ে উঠেছে। মানুষের নিরাপত্তা রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতার প্রশ্নও উঠছে। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে মানুষ অনেক বিরূপ মন্তব্য করছে। জনমনে যে প্রশ্নটি উত্তরসহ প্রকাশিত হচ্ছে, তা হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতিকল্পে সত্যিই কি কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? উত্তরটি না হয় ঊহ্যই থাকল।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, তা হলো, অপ্রতিম যাদের সঙ্গে মিশত, তাদের ব্যাপারে তার অভিভাবকেরা কি কিছুই জানতেন না? মৃত্যুর পর বিভিন্ন মাধ্যমে অপ্রতিমের যে ছবি বা ভিডিও দেখা গেছে, তার বেশির ভাগই যে শিশুতোষ বিনোদনের ব্যাপার ছিল না, সে কথা পরিষ্কার। অপ্রতিম কেন ওর সমবয়সীদের মধ্যে খেলার সঙ্গী খুঁজে পেল না কিংবা এমন সব কিশোরদের সঙ্গে মিশল, যারা বখে গেছে, সে প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যাবে।
তৃতীয় আরেকটি বিষয়ও গোচরে আনা দরকার। অপ্রতিমকে হত্যার দায়ে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা শিশুটিকে হত্যা করার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে রকম কোমলমতি শিশু-কিশোরের অভিনয় করে গেছে, তাতে তারা বড় বড় অভিনয়শিল্পীকেও অভিনয়ে ছাড়িয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রতিমের জন্য এই কিশোরদের কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণের ঘটনা সত্যিই মর্মান্তিক। এই বয়সী ছেলেরা এ রকম নৃশংস একটি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরও কতটা স্বাভাবিক ছিল, ভাবা যায়!
ঘটনাটি শুধু অপ্রতিমেই থেমে নেই। সবার অগোচরে কি এমন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে, যাদের মনে লোভ, ঘৃণা, হিংসা, পাশবিকতা জায়গা করে নিয়েছে এবং ভাবনার জগৎ থেকে যারা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে ভালোবাসা, মানবতা, স্নেহ, শ্রদ্ধা নামক শব্দগুলো? এমন একটি প্রজন্ম কি শক্তিশালী হয়ে উঠছে, যাদের কাছে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করাকে স্বাভাবিক ঘটনা বলেই প্রতীয়মান হয়? যদি সেটা হয়ে থাকে, তাহলে তার দায় কে নেবে? অভিভাবক শ্রেণি কি তাঁদের সন্তানেরা কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী করে, সে বিষয়ে কোনো ধারণা রাখেন না? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা কি শিক্ষার্থীদের নৈতিকভাবে তৈরি না করে শুধু জিপিএ-৫-এর স্বপ্নে মোহাবিষ্ট থাকেন? সরকার কি শুধু পূর্ববর্তী সরকারের দোষ ধরা এবং আত্মপ্রশংসায় মগ্ন থাকবে, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে?
অপ্রতিম ফিরে আসবে না। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো এভাবেই অনবরত করে যেতে হবে। নিরাপত্তার বিষয়টির সঙ্গে জীবনের কতগুলো দিক যুক্ত আছে, সে কথা আমরা কবে বুঝতে শিখব?