1. nskibria2012@gmail.com : যুগ যুগান্তর : যুগ যুগান্তর kibria
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৪ পূর্বাহ্ন

ভাত খাওয়া কমছে, বদলাচ্ছে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস

প্রতিনিধির নাম
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার পঠিত

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন শুধু মানুষের পাতে কী থাকছে, তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষি, পুষ্টি, জনস্বাস্থ্য, বাজার ও ভবিষ্যৎ খাদ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একসময় ভাতের সঙ্গে বাঙালির খাদ্যপরিচয়ের সম্পর্ক এতটাই নিবিড় ছিল যে ‘ভেতো বাঙালি’ কথাটিই সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সেই চিত্র বদলাচ্ছে।

২০০২ সালে একজন মানুষ প্রতিদিন প্রায় ৪৪০ গ্রাম চালের ভাত খেতেন, যা এখন নেমে এসেছে প্রায় ৩২৮ গ্রামে। অর্থাৎ মাথাপিছু ভাতের গ্রহণ প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। একই হিসাবে বছরে চালের ভাত গ্রহণ ২১৮ কেজি থেকে ১৭৮ কেজিতে নেমেছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু খাদ্যাভ্যাসে নয়, কৃষি উৎপাদন, জমির ব্যবহার, বাজারের চাহিদা ও রাষ্ট্রের খাদ্য পরিকল্পনাতেও পড়বে। গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদে চালনির্ভরতা কমে খাদ্যে বৈচিত্র্য বাড়ার প্রবণতাও দেখা গেছে। ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মাথাপিছু দৈনিক চাল গ্রহণ ১৫ শতাংশ কমার পাশাপাশি ডিমের গ্রহণ দ্বিগুণ, ফলের ১৪৩ শতাংশ, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের ৬১ শতাংশ এবং মাংসের গ্রহণ ৩৮ শতাংশ বেড়েছে।

 

ভাত কমেছে মানেই মানুষের মোট খাদ্যগ্রহণ কমেছে, এমন নয়। বরং খাদ্যের ধরন বদলাচ্ছে। মাছ, ডিম, মুরগি, মাংস, শাকসবজি ও ফলমূল মানুষের পাতে আগের তুলনায় বেশি জায়গা করে নিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, বাংলাদেশে মাছ, ডিম ও মাংসের গ্রহণ কয়েক দশক ধরে বেড়েছে এবং ২০০০ সালের পর ফল, সবজি ও দুধের গ্রহণেও উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বগতি ঘটেছে। অর্থাৎ বাঙালির খাবারের প্লেট ধীরে ধীরে একমাত্র চালকেন্দ্রিকতা থেকে বৈচিত্র্যের দিকে এগোচ্ছে।

পুষ্টির দিক থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। ভাত মূলত শক্তি ও কার্বোহাইড্রেটের উৎস। অন্যদিকে মাছ, ডিম, দুধ, ডাল, শাকসবজি ও ফলমূল থেকে শরীর প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও অন্যান্য অনুপুষ্টি পেতে পারে। খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য বাড়লে অপুষ্টি ও হিডেন হাঙ্গারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সুযোগও বাড়ে। তবে খাদ্যের বৈচিত্র্য মানেই সুষম খাদ্য নয়। ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, চাল গ্রহণ কমলেও তা তখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ওপরে ছিল। বিপরীতে ডাল, ডিম, মাংস, মাছ, দুধ, ফল ও সবুজ শাকসবজির অনেকগুলোর গ্রহণ ছিল সুপারিশকৃত মাত্রার নিচে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ভাত কমানো নয়, ভাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে একটি সত্যিকার সুষম খাদ্যতালিকা গড়ে তোলা।

 

খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তনের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নও গভীরভাবে যুক্ত। ভাত কমিয়ে মাছ, ডিম, শাকসবজি ও ফলমূল বাড়ানো পুষ্টির ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে প্রোটিনের চাহিদা পূরণে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস, তেলেভাজা ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকলে এক খাদ্যঝুঁকি কমিয়ে অন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গবেষণায় খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় চর্বির অংশ বৃদ্ধির বিষয়টিও উঠে এসেছে। আবার এর সুফল সব শ্রেণির মানুষ সমানভাবে পাচ্ছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে কম; সাম্প্রতিক জাতীয় পুষ্টি নজরদারি গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের বড় একটি অংশের খাদ্যতালিকা পর্যাপ্ত বৈচিত্র্যময় নয় এবং ৮৬ শতাংশের ফল ও সবজি গ্রহণ অপর্যাপ্ত বলে পাওয়া গেছে। তাই ভাত কমেছে বলেই সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। দেখতে হবে, সেই ঘাটতি কোন খাবার দিয়ে পূরণ হচ্ছে, তার পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা কেমন এবং নিম্নআয়ের মানুষ সেসব খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেন কি না।

এখানেই খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষিনীতিকে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। মানুষের খাদ্যচাহিদা বদলালে কৃষির উৎপাদন কাঠামোকেও বদলাতে হবে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধান উৎপাদনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। দেশের প্রধান খাদ্য ভাত এবং কৃষকের জীবিকার বড় অংশ ধানের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু খাদ্যচাহিদা বৈচিত্র্যময় হওয়ায় কৃষিনীতিকেও শুধু ধান উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন নয়।

ধানের পাশাপাশি শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, তেলবীজ, মাছ, ডিম, দুধ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এতে পরিবর্তিত খাদ্যচাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষকের নতুন বাজার ও আয় সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন খাদ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণেও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। গবেষণাতেও চালের পাশাপাশি মাছ, ডিম, মাংস, ফল ও সবজির দিকে চাহিদা সরে যাওয়ার প্রবণতা চিহ্নিত হয়েছে। ফলে কৃষকের জমিতে কী উৎপাদিত হবে, সে সিদ্ধান্তে অতীতের খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাজারচাহিদা ও পুষ্টির প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

 

তবে এর অর্থ ধানকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা নয়। ধান থাকবে খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কিন্তু তার পাশাপাশি ফসলের বৈচিত্র্যকে কৃষির প্রান্তিক বিষয় না রেখে মূল পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। কৃষিজমি সীমিত, অথচ মানুষের পুষ্টির চাহিদা বহুমাত্রিক। একই জমিতে বারবার একই ধরনের ফসল উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মাটির স্বাস্থ্য, পানির ব্যবহার ও কৃষকের আয়কে প্রভাবিত করতে পারে।

পরিকল্পনাবিদদের মানুষের পরিবর্তিত খাদ্যচাহিদাকে কৃষির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি ভালো খবর তখনই সত্যিকার অর্থে বড় সুখবর হয়ে উঠবে, যখন ভাতের ওপর চাপ কমার সঙ্গে কৃষকের আয় বাড়বে, মানুষের পুষ্টি উন্নত হবে, হিডেন হাঙ্গার কমবে এবং নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা শক্তিশালী হবে।
অন্যদিকে শাকসবজি, ফল, ডাল ও তেলবীজসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়লে খাদ্যব্যবস্থা যেমন বৈচিত্র্যময় হবে, তেমনি কৃষকের বাজারও বিস্তৃত হতে পারে। তবে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, কৃষককে ন্যায্য দামও দিতে হবে। বাজারব্যবস্থা দুর্বল থাকলে নতুন ফসলের চাহিদা থাকলেও কৃষক উৎপাদনের ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। তাই খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনকে কৃষকের উৎপাদন সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করতে বাজারতথ্য, চাহিদার পূর্বাভাস, সংরক্ষণ সুবিধা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা একসঙ্গে ভাবতে হবে। মানুষের পাতে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, কৃষকের মাঠেও তার প্রতিফলন ঘটাতে হলে পরিকল্পনাকে ভোক্তা ও উৎপাদক—উভয় দিক থেকেই দেখতে হবে।

এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িয়ে আছে, সেটি হলো নিরাপদ খাদ্য। শাকসবজি ও ফলমূলের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে অতিরিক্ত বা অনিরাপদ কীটনাশক, রাসায়নিক সার ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপকরণের ব্যবহার হলে পুষ্টিকর খাদ্যও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই ফসলের বৈচিত্র্য মানে শুধু বেশি ধরনের ফসল নয়, নিরাপদ ও টেকসই পদ্ধতিতে উৎপাদন এবং মাটি, পানি ও পরিবেশের স্বাস্থ্য রক্ষা।

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনকে কৃষি, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবেশ থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। যে পরিবার ভাত কমিয়ে মাছ, ডিম, শাকসবজি ও ফলমূল বাড়াচ্ছে, তাদের জন্য এসব খাবার নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করাও খাদ্যনীতির দায়িত্ব। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন লাভজনক করতে গবেষণা, উন্নত জাত, সেচ, সংরক্ষণ, বাজারসংযোগ ও নিরাপদ উৎপাদন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাহলেই খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন শুধু ভোক্তার আচরণে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সুস্থ ও টেকসই খাদ্যব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে ভাত খাওয়ার এই পরিবর্তনকে শুধু একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি ও কৃষির পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। ৪৪০ গ্রাম থেকে ৩২৮ গ্রামে নেমে আসা মাথাপিছু দৈনিক চালের ভোগের যে তথ্য সামনে এসেছে, তার ভিত্তিতে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন চাল উৎপাদনের চাপ কমার সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে। তবে এই হিসাবের ক্ষেত্রে গবেষণায় ব্যবহৃত সংজ্ঞা, জনসংখ্যা ও চালের একক যাচাই করে নেওয়া জরুরি, কারণ দৈনিক ও বার্ষিক ভোগের পরিসংখ্যান সব গবেষণায় একই পদ্ধতিতে নির্ধারিত হয় না।

 

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও দেখাচ্ছে, খাদ্যতালিকা ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যময় হচ্ছে, যদিও কাঙ্ক্ষিত পুষ্টিমান এখনো অর্জিত হয়নি। তাই মানুষের খাদ্যাভ্যাস যে দিকে যাচ্ছে, কৃষি উৎপাদনকেও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ভাত থাকবে, ধানও থাকবে, কিন্তু পাশাপাশি পুষ্টিকর শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ, ডিম ও অন্যান্য নিরাপদ খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে।

পরিকল্পনাবিদদের মানুষের পরিবর্তিত খাদ্যচাহিদাকে কৃষির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি ভালো খবর তখনই সত্যিকার অর্থে বড় সুখবর হয়ে উঠবে, যখন ভাতের ওপর চাপ কমার সঙ্গে কৃষকের আয় বাড়বে, মানুষের পুষ্টি উন্নত হবে, হিডেন হাঙ্গার কমবে এবং নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থার আগামী দিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পেট ভরানো নয়, নিরাপদ, বৈচিত্র্যময়, পুষ্টিকর ও কৃষকবান্ধব খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..