মোঃ মাসুম রেজা, জয়পুরহাট প্রতিনিধি:
শীতের হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আর শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গাছিরা। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন খেজুরগাছ প্রস্তুত ও রস সংগ্রহের কর্মযজ্ঞ চলছে।
উপজেলার অন্তত অর্ধশত এলাকায় রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা গাছিরা অস্থায়ী ঘর তৈরি করে রস সংগ্রহ করছেন। বিকেলে গাছে গাছে মাটির পাতিল (ভাঁড়) ঝুলিয়ে রাখা এবং কাকডাকা ভোরে সেই পাতিল থেকে রস সংগ্রহের দৃশ্য এখন গ্রামাঞ্চলে চোখে পড়ছে। পরে সংগৃহীত রস বড় পাত্রে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে সুস্বাদু খেজুরের গুড়।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ধরঞ্জী ইউনিয়নের কোতোয়ালীবাগ গ্রামে অস্থায়ী বসতি গড়েছেন কয়েকজন গাছি। রাজশাহীর বাঘা পৌরসভার দক্ষিণ মিলিকপাড়া মহল্লা থেকে গুড় তৈরির জন্য এসেছেন হামিদুল ইসলামসহ তিনজন গাছি। তাঁরা কোতোয়ালীবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে খেজুরপাতা দিয়ে অস্থায়ী থাকার ঘর তৈরি করেছেন। পাশেই রস জ্বাল দেওয়ার জন্য তৈরি করেছেন দুটি মাটির চুলা।
গাছি হামিদুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর শীতের শুরুতে আমরা বিভিন্ন এলাকায় রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির জন্য যাই। গত বছরও এখানে এসেছিলাম, এবারও এসেছি। রাস্তার পাশের ও ব্যক্তিমালিকানাধীন মোট ১৬০টি খেজুরগাছ রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করেছি। এখন শীতের তীব্রতা কম থাকায় রসের পরিমাণও কম। শীত যত বাড়বে, গাছে রসের পরিমাণ তত বাড়বে। তখন প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত গুড় তৈরি করা সম্ভব হবে।
উপজেলার উচাই গ্রামে গুড় তৈরির জন্য আসা একই জেলার গাছি হারেছ উদ্দিন বলেন, প্রতি কেজি গুড় তৈরি করতে প্রায় ৭ থেকে ৮ কেজি রসের প্রয়োজন হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে একটি গাছ থেকে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত রস পাওয়া যায়। জ্বালানি ও শ্রমিকের খরচ বাদ দিয়ে মৌসুমে ভালো আয় করা সম্ভব। এবার তিনি ১২০টি খেজুরগাছ রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করেছেন।
খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা-পায়েসের স্বাদ অতুলনীয় হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এ গুড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অনেকেই সরাসরি গুড় তৈরির প্রক্রিয়া দেখতে গাছিদের কাছে ছুটে যান এবং সেখান থেকেই গুড় সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া গাছিরা বিভিন্ন হাট-বাজার ও দোকানে পাইকারি দরে গুড় বিক্রি করেন। বর্তমানে প্রতি কেজি খেজুরের গুড় বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা দরে।
স্থানীয় বাসিন্দা কোতোয়ালীবাগ গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, গাছিরা আমাদের গ্রামে আসায় আমরা খাঁটি ও ভেজালমুক্ত গুড় পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। বাজার থেকে কেনা গুড়ে অনেক সময় চিনি মেশানো থাকে। কিন্তু এখানে নিজের চোখের সামনে গুড় তৈরি হতে দেখার পাশাপাশি সরাসরি গাছিদের কাছ থেকে গুড় কিনতে পারছি। শীতের পিঠা-পায়েস খেজুরের গুড় ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ।
তবে প্রতিবছর খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরি করে ভালো আয় করলেও দিন দিন খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এ পেশা হুমকির মুখে পড়ছে বলে জানিয়েছেন গাছিরা। তাঁদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড় তৈরির শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।