নিজস্ব প্রতিবেদক:
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায়ও বাড়ছে দেশের সবুজ কারখানা। সম্প্রতি নতুন করে আরো তিনটি কারখানা ইউনাইটেড স্টেটস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) সনদ পেয়েছে। সবুজ পোশাক কারখানা ভবনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে আছে। বাংলাদেশের পরের অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া।
উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এর ফলে বিশ্ববাজারে দেশের পোশাক খাতের ব্র্যান্ডিং ও আস্থা বাড়ছে ক্রেতাদের মধ্যে। গতকাল তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংস্কার, পারফরম্যান্স, জ্বালানি, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ কয়েকটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে কারখানাগুলোকে সবুজ কারখানা স্বীকৃতি দেয় ইউএসজিবিসি।
বিজিএমইএ জানায়, দেশে মোট সবুজ কারখানা ১৭৬টি। এর মধ্যে ৫৭টি প্লাটিনাম, ১০৫টি গোল্ড এবং ১০টি সিলভার। তবে চারটি কারখানা কোনো রেটিং পায়নি, শুধু সনদ পেয়েছে। এ ছাড়া আবেদন করা আছে আরো ৫৫০টিরও বেশি কারখানার।
বিজিএমইএ জানায়, নতুন করে সবুজ কারখানার সনদ পাওয়া তিন কারখানার মধ্যে দুটি গাজীপুরের ও একটি ময়মনসিংহের। এই তিন পোশাক কারখানাকে দেওয়া হয়েছে প্লাটিনাম রেটিং।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল কালের কণ্ঠকে বলেন, মহামারি করোনা ও বৈশ্বিক মন্দার পরও দেশের তৈরি পোশাক খাতের কারখানাগুলো সবুজ সনদ পোশাকের ব্র্যান্ডিংয়ে সাহায্য করছে। এর ফলে ক্রেতার আস্থা অর্জনেও সাহায্য করছে। এ ছাড়া পোশাক দেশের শিল্প প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে অনেকটা ভালো অবস্থানে রয়েছে।
বিজিএমইএ জানায়, নতুন করে যেসব প্রতিষ্ঠান ইউএসজিবিসি সনদ পেয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান হলো গাজীপুরের এ সি নিটওয়্যার লিমিটেড, সিল্কেন সুইং লিমিটেড এবং ময়মনসিংহের সুলতানা সোয়েটার্স লিমিটেড।
জানা গেছে, বাংলাদেশের আরো প্রায় ডজনখানেক কারখানা পরিবেশসম্মত সবুজ কারখানার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন (লিড) সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বর্তমানে রেমি হোল্ডিংস ও ফতুল্লা অ্যাপারেলস ১১০-এর মধ্যে ৯৭ পয়েন্ট নিয়ে যৌথভাবে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) বিবেচনায় বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ এবং সবুজ পোশাক কারখানার দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ইফেকটিভ ম্যানেজমেন্ট অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ক্যাটাগরিতে সেরা হিসেবে পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএকে মনোনীত করা হয়েছে।
মূলত, বিশ্বের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব স্থাপনার সনদ দিয়ে থাকে। তাদের মধ্যে একটি ইউএসজিবিসি। তারা লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন বা ‘লিড’ নামে পরিবেশবান্ধব স্থাপনার সনদ দিয়ে থাকে। সাধারণ স্থাপনার চেয়ে পরিবেশবান্ধব স্থাপনায় ৫-২০ শতাংশ খরচ বেশি হয়। এ ছাড়া ইউএসজিবিসি লিড সনদ পেতে স্থাপনা নির্মাণে অন্তত ৯টি শর্ত পরিপালন করতে হয়।
এই সনদ পেতে একটি প্রকল্পকে ইউএসজিবিসির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ থেকে উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোচ্চ মান রক্ষা করতে হয়। ভবন নির্মাণ শেষ হলে কিংবা পুরনো ভবন সংস্কার করেও লিড সনদের জন্য আবেদন করা যায়। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউএসজিবিসি।
এর আগে গত বছর (২০২১ সালে) সবুজায়নে ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) পক্ষ থেকে লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড তথা বিশ্বে প্রথম ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল অ্যাওয়ার্ড পায় বিজিএমইএ। বৈশ্বিক পোশাক শিল্প জগতে বিজিএমইএ হচ্ছে একমাত্র সংগঠন যারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই পদক অর্জন করে। এ ছাড়া বিশ্বের শীর্ষ ১০ পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার মধ্যে ৯টির মালিক বাংলাদেশ।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের মে মাসে বাংলাদেশের ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও বিশ্বের প্রথম এলইইডি প্লাটিনাম সার্টিফায়েড কারখানা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ওই বছর পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা সাজ্জাদুর রহমান মৃধার হাত ধরে প্রথম পরিবেশবান্ধব কারখানার যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশে। পাবনার ঈশ্বরদী ইপিজেডে তিনি স্থাপন করেন ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও। তাঁর দেখানো পথ ধরেই দেশে একটার পর একটা পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা গড়ে উঠছে। উজ্জ্বল হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি।
এর পরের বছর, ২০১৩ সালে রাজধানীতে রানা প্লাজা ভবন ধসে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণ হারান এক হাজার ১৩৪ জন। সেই ঘটনার পর সবুজ উদ্যোগে প্রচুর বিনিয়োগ শুরু করেন পোশাক উদ্যোক্তারা।
২০১৪ সালে সবুজ কারখানা স্থাপন করা হয় আরো তিনটি। ২০১৫ সালে হয় ১১টি। ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে স্থাপন করা হয় যথাক্রমে ১৬, ১৮ ও ২৪টি। ২০১৯ সালে আরো ২৮টি সবুজ কারখানা গড়ে তোলেন উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া ২০২০ ও ২০২১ সালে ২৪টি করে আরো ৪৮টি কারখানা গড়ে তোলা হয়।
Leave a Reply