নিজস্ব প্রতিবেদক:
আন্তর্জাতিক প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত জাভেদ এ মতিন (৬৩) যুক্তরাষ্ট্রে নিজ কোম্পানি ভেলটেক্স করপোরেশনের শেয়ার কারসাজি থেকে ৬৫ লাখ ডলার এবং হংকংয়ের একটি কোম্পানি থেকে প্রতারণা করে ১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার হাতিয়েছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ অর্থের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি। ২০২০ সালের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পালিয়ে আসার সময় জাভেদ বৈধ-অবৈধ উভয় পথে বাংলাদেশ ও ইউরোপের অন্য একটি দেশে এ অর্থ পাচার করেন।
পাচার করা অর্থ বাংলাদেশে আনায় সার্বিক সহায়তা দিয়েছেন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সংশ্নিষ্ট সূত্রে এমন তথ্য পায় সমকাল। তার পরই অধিকতর অনুসন্ধান শুরু করা হয়।
হুন্ডির মাধ্যমে আনা টাকার প্রমাণ বাস্তব কারণে সংগ্রহ করা যায়নি। তবে দেড় বছরের অনুসন্ধানে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে জাভেদ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যত অর্থ এনেছেন, তার মধ্যে ১৪ লাখ ৯৪ হাজার ডলার বা সোয়া ১২ কোটি টাকার প্রমাণ ও নথি পেয়েছে সমকাল। এর মধ্যে সহায়তাকারী ওই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে ১৪ লাখ ২০ হাজার ৬৪৭ ডলার। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিতে কর্মকর্তার যোগ দেওয়ার মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তাঁর অ্যাকাউন্টে টাকা জমা শুরু হয়।
ওই কর্মকর্তার কয়েকটি ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি জিন বাংলা ফেব্রিক্স নামে তাঁর একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের বিবরণও সংগ্রহ করেছে সমকাল। ব্যাংক স্টেটমেন্টগুলো পরীক্ষায় দেখা যায়, সাউথইস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ২০২০ সালের ১৪ জুলাই থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ১৪ লাখ ২০ হাজার ৬৪৭ ডলার বা তৎকালীন বিনিময় হারে ১১ কোটি ৬৬ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫৩ টাকা রেমিট্যান্স আকারে জমা হয়।
ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কর্মকর্তাটির ব্যাংক এশিয়ায় ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে (যার নম্বর-০২১৩৪০০০৫২৪) মোট ১২ দফায় ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৫৩০ ডলার বা ৫ কোটি ৬ লাখ ২৮ হাজার ৬০৩ টাকার রেমিট্যান্স এসেছে। এ ছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংকের সাতমসজিদ রোড শাখার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে (নম্বর-০০৫৩৭৩১০০০০০১০৯) তিনি পেয়েছেন মোট ২ লাখ ২৮ হাজার ৫৭১ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় তখন ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০২০ সালের ১৪ জুলাই এক দিনেই মোট চার দফায় তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এ অর্থ যোগ হয়েছিল।
উপরোক্ত দুই ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বাইরে জিন বাংলা ফেব্রিক্স নামে একটি কোম্পানির অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্স গ্রহণ করেন শীর্ষস্থানীয় ওই কর্মকর্তা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় খোলা এ অ্যাকাউন্টে (নম্বর-১২০২১০০০০৯১২) মোট ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৫৪৬ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ কোটি ৬৮ লাখ ৫ হাজার ৯৫০ টাকা আসে। ২০২০ সালের ২৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এ অর্থ পান ওই কর্মকর্তা এবং এর পর নিজেই অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেন।
ব্যাংকিং চ্যানেলে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার অ্যাকাউন্টে জাভেদ যে টাকা পাঠিয়েছেন, তার মধ্যে ব্যাংক এশিয়ার অ্যাকাউন্টে টাকা এসেছে নিউইয়র্কের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের নস্ট্র অ্যাকাউন্টের (বৈদেশিক মুদ্রাকে স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরের) মাধ্যমে। ২০২০ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২৫ নভেম্বরের মধ্যে এই রেমিট্যান্স যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জিই ক্রেডিটের (জেনারেল ইলেকট্রিক ক্রেডিট ইউনিয়ন) মাধ্যমে পাঠান জাভেদ।
সাউথইস্ট ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকেছে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন হয়ে। তবে ব্যাংকটি এ অর্থ গ্রহণ করে নিউইয়র্কভিত্তিক অর্থ লেনদেন প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এফসি স্টোন লিমিটেড (স্টোন-এক্স নামে সমধিক পরিচিত) থেকে। এ প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও কোম্পানি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন সেবা দেয়।
বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাচার
প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পাচার করা অর্থের একটা অংশ আনতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করেছেন জাভেদ। তিনি বাংলাদেশে এ টাকা পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে খোলা তাঁর অনিবন্ধিত কোম্পানি মোনার্ক হোল্ডিংস ইনকরপোরেশনের ব্যাংক অব আমেরিকা ও ইউএস ব্যাংকের পৃথক তিনটি অ্যাকাউন্ট থেকে। ওই তিন অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয় ওই কর্মকর্তার কাছে টাকা পাঠানোর কারণ হিসেবে পারিবারিক প্রয়োজন উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ জাভেদ তাঁকে সহায়তাকারী সংশ্নিষ্ট শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাকে পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এর বাইরে ২০১৬ সালেই বন্ধ হওয়া কোম্পানি থেকে স্টক লট হিসেবে তৈরি পোশাক ক্রয়ের নামে নগদ অর্থ পাঠানোর কথা উল্লেখ করেন।
পাচার করে আনা অর্থের একটা অংশ হংকংভিত্তিক কোম্পানি মিং গ্লোবালের। এ প্রতিষ্ঠানটি তার অর্থ উদ্ধারে শীর্ষস্থানীয় ওই কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি আইনি নোটিশ পাঠায় এবং দুদকে অভিযোগ করে। এর পর কর্মকর্তাটি নিজে বাঁচতে গ্রহণ করা অর্থের একটা অংশ প্রকৃত দাবিদারকে ফেরত দিতে চান মর্মে ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম জজ আদালতে প্রকৃত দাবিদার নির্ধারণে একটি মামলা (ইন্টারপ্লিডার সু) দায়ের করেন। ওই মামলার আর্জিতে তিনি দাবি করেন, জাভেদের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি মাটেস্টা অ্যাপারেলকে বাড়িভাড়ার অগ্রিম হিসেবে ২ কোটি ৭২ লাখ টাকা নিয়েছেন। যদিও এর প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা সাদা কাগজে তাঁর স্বাক্ষর ও সাক্ষীবিহীন একটি চুক্তিপত্রে অগ্রিম হিসেবে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা নেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল।
Leave a Reply