কক্সবাজার প্রতিনিধি :
কুমিল্লার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেনকে ১৭ অক্টোবর রাতে চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নয়াপাড়ার সবুজ পাহাড়ে স্থানীয় লোকজন দেখতে পান। তখন তার হাতে ছিল গামছা মোড়ানো কোরআন শরিফ!
স্থানীয়রা জানান, তারা ইকবালকে আটক করেন। এসময় স্থানীয়রা তাকে প্রথমে রোহিঙ্গা বা অন্য ধর্মের অনুসারী মনে করে নানা ধরনের প্রশ্ন করেন। তখন নিজেকে মুসলিম এবং নাম ইকবাল হোসেন বলার পর স্থানীয়রা তাকে কলেমা পড়তে বললে গড় গড় করে তা পাঠ করেন। পরে স্থানীয়রা বুঝতে পারেন, সে সত্যিকার অর্থে মুসলিম।
স্থানীয়রা আরো জানান, প্রশ্নোত্তরে ইকবাল তার বাড়ি কুমিল্লা এবং তিনি কক্সবাজার শহরে হোটেলে কাজ করে বলে দাবি করেন। এই অবস্থায় হাতে থাকা গামছা মোড়ানো কোরআন শরিফটি তার কাছ থেকে স্থানীয় বাসিন্দা রমজান আলী মোর্শেদ নিয়ে নেন। এরপর তাকে কক্সবাজার শহরের একটি গাড়িতে তুলে দেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুটাখালী সবুজ পাহাড় এলাকার স্থানীয়দের ধারণা, কুমিল্লায় ধর্ম অবমাননার ঘটনার পর নিজেকে বাঁচাতে কক্সবাজারে আত্মগোপনে চলে আসেন ইকবাল। কিন্তু কক্সবাজার শহরে পৌঁছার আগেই ১৭ অক্টোবর রাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার খুটাখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় নেমে যান তিনি। এসময় মহাসড়কের পাশেই তিনি দেখতে পান উঁচু পাহাড়ের ওপর মন্দির সদৃশ কোনো স্থাপনা রয়েছে। সেখানেও তিনি যান। ওই সময় তার হাতে ছিল কোরআন শরিফ।
চকরিয়া থানার ওসি মো. ওসমান গণি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কুমিল্লায় ধর্ম অবমাননায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন কক্সবাজার শহর থেকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাবাসাদে বিভিন্ন তথ্য দেয়। সেই জিজ্ঞাসাবাদে ইকবাল চকরিয়ার খুটাখালীতেও অবস্থান করার বিষয়টি স্পষ্ট হয় পুলিশ। তখন কুমিল্লা থেকে পুলিশ কর্মকর্তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে ব্যাপক তদন্ত শুরু করি। অবশেষে চকরিয়ায় ইকবাল অবস্থান করার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হই এবং ইকবালের কাছ থেকে স্থানীয় রমজান আলী মোর্শেদের উদ্ধারকৃত পবিত্র কোরআন শরিফটিও পুলিশ হেফাজতে নিই। এসব বিষয় কক্সবাজার জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি এবং কুমিল্লা জেলা পুলিশকেও সবিস্তারে জানানো হয়। এ সংক্রান্তে চকরিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরিও রুজু করা হয়।’
চকরিয়া থানার ওসি ওসমান গণি আরো বলেন, ‘খুটাখালীর সবুজ পাহাড়ের ওপর সিঁড়ি এবং তারও ওপরে থাকা স্থাপনাকে হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো মন্দির বলে মনে করেছিল ইকবাল। স্থানীয়রা সেই বিষয়টি পুলিশকেও জানিয়েছেন। তবে কুমিল্লার ঘটনার পর যেহেতু সারা দেশে সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেই কারণে স্থানীয়রা ইকবালের শুরু থেকে সর্বশেষ খুটাখালীতে অবস্থান এবং ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ায়নি। পরে সেই ফুটেজ আমরা সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্টদের বরাবরে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
খুটাখালীর পাহাড়ি গ্রাম সবুজ পাড়ার পাহাড়ের ওপরের বাড়িটির মালিক স্থানীয় রমজান আলী মোর্শেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ১৭ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে আমি নিজ বাড়ি ফিরছিলাম। এ সময় মহাসড়ক থেকে পাহাড়ের চূড়ায় যেতে পাকা সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলাম। ওইসময় বাড়ির গেটের কাছে সিঁড়িতে দেখতে পাই, কেউ একজন বসে আছে। তার হাতে রয়েছে গামছা মোড়ানো একটি কোরআন শরিফও। এ সময় চিৎকার দিলে বাড়ি থেকে পরিবার সদস্যরা ছুটে আসেন। এই অবস্থায় বসে থাকা অপরিচিত ব্যক্তিটি নিজেকে কুমিল্লার ইকবাল বলে পরিচয় দেয়। তখন তাকে আমরা প্রথমে হিন্দু মনে করেছিলাম। একের পর এক প্রশ্ন করার পর তার হাতে থাকা কোরআন শরিফটি নিয়ে ফেলি এবং তার কথা মতো কক্সবাজার শহরের একটি গাড়িতে তুলে দিই।’
রমজান আলী মোর্শেদ আরো বলেন, ‘পুরো ঘটনাটি নিজের মোবাইলে আমি ভিডিও ধারণ করি। তবে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াইনি। যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার মতো কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। পরবর্তীতে সেই ভিডিও ফুটেজ পুলিশকে সরবরাহ করেছি। ইকবালের কাছ থেকে যে কোরআন শরিফটি আমরা নিয়েছিলাম, সেটি পুলিশ হেফাজতে দেওয়া হয়।’
ইকবালের উদ্বৃতি দিয়ে খুটাখালীর রমজান আলী মোর্শেদ জানান, ইকবালের হাতে গামছা মোড়ানো যে কোরআন শরিফ দেখতে পেয়েছেন, সেটি তার (ইকবাল) নানার দেওয়া এবং ঘর ছেড়ে তিনি পালিয়ে এসেছেন বলেও তাদেরকে জানান ইকবাল।
এর আগে গত ২১ অক্টোবর রাতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে ইকবাল হোসেনকে আটক করে পুলিশ। এরপর ২২ অক্টোবর সকালে কুমিল্লা জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় তাকে।
Leave a Reply