নিজস্ব প্রতিবেদক:
উচ্চশিক্ষায় এত দিন শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিষয় ছিল বিবিএ-এমবিএ। চাহিদা বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিবিএ-এমবিএর নতুন বিভাগ খোলা বা আসন ছিল বেশি। কিন্তু কর্মবাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে সেই চাহিদায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষে আছে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলো।
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০২০ সালে জাতীয়, উন্মুক্ত ও আরবী বিশ্ববিদ্যালয় বাদে ৪৩ সরকারি ও ১০৪ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭.১০ শতাংশ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪২.০৮ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলোতে পড়াশোনা করছেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (সিএসই) ছাত্র সামিউল ইসলাম অর্কের কথায়ও ইউজিসির তথ্যের প্রমাণ মেলে। উচ্চশিক্ষায় তাঁর স্বপ্ন ছিল বিবিএ পড়ার। কিন্তু এইচএসসি পাসের পর যুগোপযোগী বিষয় সম্পর্কে খোঁজখবর নেন তিনি। কাজের ব্যাপক পরিসর দেখে বিবিএর স্বপ্ন বাদ দিয়ে সিএসইতে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
শুধু সামিউল নন, উচ্চশিক্ষার কয়েক বছরের তথ্য ঘেঁটে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলোতে অন্য শিক্ষার্থীদেরও আগ্রহের বিষয়টি সামনে এসেছে।
জানতে চাইলে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বর্তমানে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশ এখন ইন্ডাস্ট্রির দিকে যাচ্ছে। আইসিটির নানা ক্ষেত্র বাড়ছে। ফলে এসব ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ বেশি। তাই এখন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয় খোলা হচ্ছে। সরকারও প্রকৌশল, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও কৃষির জন্য বিশেষায়িত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে। ’
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুর রব বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন সিএসই, সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের চাহিদা বেশি। অথচ কয়েক বছর আগেও বিবিএর চাহিদা ছিল বেশি। এর প্রধান কারণ হলো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়গুলোতে চাকরির সুযোগ বেশি। সরকারি-বেসরকারিভাবে দেশে এখন অবকাঠামো, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হচ্ছে। নতুন নতুন ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে। সেখানে প্রকৌশলীরা সহজেই চাকরি পাচ্ছে। ’
ইউজিসির তথ্য মতে, ৪৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল তিন লাখ ১৪ হাজার ৯৩০ জন। এর মধ্যে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন ৫৩ হাজার ৮৪৭ জন (১৭.১০%)। আর ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে পড়ছিলেন ৪৫ হাজার ২৭৫ জন (১৪.৩৮%)।
ইউজিসির তথ্য বলছে, ২০২০ সালে ১০০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল তিন লাখ ২৮ হাজার ৬৮৯ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এক লাখ ৩৮ হাজার ৩১২ শিক্ষার্থীই (৪২.০৮%) প্রকৌশল ও প্রযুক্তির শিক্ষার্থী। ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী ৭৮ হাজার ৬২৪ জন (২৩.৯২%)।
২০১৯ সালের ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই লাখ ৯৭ হাজার ৯৫৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে পড়ছিলেন ৫২ হাজার ৭০৪ জন (১৭.৬৯%)। আর ব্যবসায় শিক্ষায় পড়ছিলেন ৪১ হাজার ৯০ জন (১৩.৭৯%)।
একই বছর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন লাখ ৪৯ হাজার ১৬০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়ছিলেন এক লাখ ৫০ হাজার ৩৯ জন (৪২.৯৭%)। আর ব্যবসায় শিক্ষায় ছিলেন ৮৭ হাজার ৬৯৫ জন (২৫.১২%)। অবশ্য আগের বছরগুলোতে ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনের বিষয়ভিত্তিক পরিসংখ্যানে প্রকৌশলকে আলাদাভাবে দেখানো হয়নি।
এটা ছিল বিজ্ঞানের একটি অংশ মাত্র। ইউজিসি সূত্র জানায়, ২০২০ সালে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও মানবিকে ১৪.০১%, সামাজিক বিজ্ঞানে ১৬.৩%, বিজ্ঞানে ১৩.১৩% শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছিলেন।
একই বছর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও মানবিকে ১০.৭৪%, সামাজিক বিজ্ঞানে ২.৯৫%, বিজ্ঞানে ৬.৭১% শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬টিই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে নামেই থাকুক না কেন তাদের প্রায় প্রতিটিতেই প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলো রয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয় খোলা ও আসন বাড়ানো তুলনামূলক সহজ হওয়ায় তারা প্রকৌশল ও প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোতে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে।
এ ছাড়া অনেক শিক্ষার্থীই ইদানীং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ না পেয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) ভর্তি হচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা এখন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই), ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্রডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজির মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে এখন মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিকসসামগ্রী, অটোমোবাইল, আইসিটিসহ নানা পণ্য উত্পাদন হচ্ছে। বিশ্বমানের একাধিক কারখানা তৈরি হয়েছে। আগে থেকেই চলমান গার্মেন্ট, টেক্সটাইলের উচ্চ পদে বিদেশিদের প্রাধান্য থাকলেও এখন তা দেশীয়দের দখলে আসছে। ফলে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলোতে ব্যাবহারিকে জোর দেওয়ায় বিদেশেও এসব বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইসিটি খাতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারও ইনভেস্ট করছে। আমাদের দেশে এখন মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ নানা ডিভাইসের অ্যাসেম্বলিংয়ের পাশাপাশি ম্যানুফ্যাকচারও শুরু হয়েছে। বড় বড় কম্পানি এসব খাতে ইনভেস্ট শুরু করেছে। এরই মধ্যে এই খাত দেশের অর্থনীতিতে ভালো অবদান রাখছে। ’
Leave a Reply