1. nskibria2012@gmail.com : যুগ যুগান্তর : যুগ যুগান্তর kibria
বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪১ অপরাহ্ন

নিকলীতে নতুন ইউএনও “শামীম আরা” নারী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় এবার প্রশাসনের বড় পরীক্ষা,

প্রতিনিধির নাম
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৮ বার পঠিত

 

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি,

হাওরের জলরাশি পেরিয়ে প্রশাসনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল নিকলী। কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত এই উপজেলায় নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা শামীম আরা। মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকা শামীম আরাকে বদলির পর গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে নিকলীর ইউএনও হিসেবে পদায়ন করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর তিনি নিকলীতে যোগদান করেন।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত শামীম আরা নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। ইউএনও হিসেবে দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি নিজ অধিক্ষেত্রে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৪৪ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগের পাশাপাশি সরকারি পাওনা আদায়ে সরকারি দাবি আদায় আইন, ১৯১৩-এর ধারা ৩(৩) অনুযায়ী সার্টিফিকেট অফিসারের ক্ষমতাও তাঁর ওপর ন্যস্ত থাকবে।
প্রজ্ঞাপনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-সংক্রান্ত শাখার সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. শওকত মেহেদী সতুর স্বাক্ষর রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরসহ কিশোরগঞ্জ ও মাদারীপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এর অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। আবারও নারী ইউএনও, ফিরল পুরোনো ধারাবাহিকতা
শামীম আরার যোগদানের মধ্য দিয়ে নিকলীর প্রশাসনের শীর্ষ পদে নারী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা আবারও দৃশ্যমান হলো।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর ২৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার নিকলীর প্রথম নারী ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর পাপিয়া আক্তার এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল রেহানা মজুমদার মুক্তি ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রেহানা মজুমদার মুক্তির বদলি/অবমুক্তির পর পদটি শূন্য হলে নতুন কর্মকর্তা পদায়নের অপেক্ষা তৈরি হয়। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই এবার দায়িত্ব নিলেন শামীম আরা। অর্থাৎ, ২০১৮ থেকে ২০২৬—প্রায় আট বছরের সময়পর্বে নিকলীর প্রশাসনের শীর্ষ নির্বাহী পদে নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি একটি উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিকতায় পরিণত হয়েছে। তবে এখানেই মূল প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। নারী ইউএনও—এটি পরিচয়; কিন্তু কেমন ইউএনও হবেন, সেটিই এখন নিকলীর মানুষের আসল প্রশ্ন।
হাওরের প্রশাসন, চ্যালেঞ্জও হাওরের নিকলীকে কেবল একটি উপজেলা হিসেবে দেখলে এখানকার প্রশাসনিক বাস্তবতা বোঝা কঠিন। বর্ষায় বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যায়। অনেক অঞ্চলে নৌপথই প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠে। কৃষি, মৎস্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পর্যটন—প্রতিটি খাতেই হাওরের নিজস্ব বাস্তবতা রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে জলাশয় ও মৎস্যসম্পদ রক্ষা, পরিবেশগত ভারসাম্য, সরকারি উন্নয়নকাজের তদারকি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার মোকাবিলা। ফলে নিকলীর ইউএনওর দায়িত্ব কেবল অফিসের টেবিল ও ফাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁকে মাঠে যেতে হবে, মানুষের কথা শুনতে হবে এবং প্রয়োজনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগে নিরপেক্ষতা ও আইনের সমান প্রয়োগ হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা। প্রভাবের বাইরে প্রশাসন—প্রত্যাশা এখানেই একটি উপজেলার প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে ইউএনওকে প্রতিদিনই নানা ধরনের দাবি, সুপারিশ ও চাপের মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব সরল—প্রশাসনের দরজা যেন কোনো বিশেষ পরিচয়ের জন্য খুলে বা বন্ধ না হয়। কারও রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রভাব যেন সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা না দেয়—এটাই জনবান্ধব প্রশাসনের মৌলিক শর্ত।
নিকলীর ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ—প্রশাসন কি থাকবে প্রভাবমুক্ত? আইন কি প্রয়োগ হবে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে? সাধারণ মানুষ অভিযোগ নিয়ে গেলে কতটা দ্রুত প্রতিকার পাবেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর নতুন ইউএনওর কর্মকাণ্ডেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে। নারী নেতৃত্বের সম্ভাবনা, প্রত্যাশাও বেশি। সেক্ষেত্রে নারী ইউএনও থাকলে বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রান্তিক নারীদের বিভিন্ন সমস্যায় অনেক নাগরিক তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যে প্রশাসনের কাছে যেতে পারেন। তবে নারী হওয়াকে প্রশাসনিক সাফল্যের নিশ্চয়তা হিসেবে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং একজন নারী বা পুরুষ যে-ই ইউএনও হোন, তাঁর মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত দক্ষতা, সততা, নিরপেক্ষতা, মানবিকতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
শামীম আরার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ নেই।
প্রথম দিন থেকেই নজর থাকবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর নিকলীর মানুষের নজর থাকবে সরকারি সেবা কতটা সহজ হচ্ছে, ভূমি ও প্রশাসনিক কাজে হয়রানি কমছে কি না, উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভূমিকা কেমন, হাওরের পরিবেশ ও জলাশয় রক্ষায় কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে।
এছাড়া পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নিকলীর সম্ভাবনাও বড়। তাই পর্যটনের সঙ্গে পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করাও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অন্যদিকে হাওরাঞ্চলে দুর্যোগের সময় দ্রুত প্রশাসনিক সাড়া জীবন ও সম্পদ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে কৃষক, জেলে, শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলোকে প্রশাসনিক অগ্রাধিকারে আনাটা হবে সময়ের দাবি।
পরিচয়ের চেয়ে কর্মই শেষ কথা। তাই নিকলীতে নারী ইউএনওদের ধারাবাহিকতা নিঃসন্দেহে আলোচনার বিষয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে একজন ইউএনওর পরিচয় তৈরি হয় তাঁর কাজ দিয়ে। কতজন মানুষের অভিযোগ শুনলেন, কতটা দ্রুত সমাধান দিলেন, অন্যায় দেখলে কতটা দৃঢ় হলেন, প্রভাবশালী ও সাধারণ নাগরিকের জন্য একই আইন প্রয়োগ করলেন কি না—এ সবই হবে প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড।
শামীম আরার সামনে তাই একই সঙ্গে রয়েছে সুযোগ ও পরীক্ষা। হাওরের মানুষের কাছে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব প্রশাসনের উদাহরণ তৈরি করার একটি সুযোগ। এছাড়াও স্থানীয় বাস্তবতা, নানা স্বার্থ ও জনপ্রত্যাশার মধ্যে থেকেও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অটুট রাখার একটি পরিক্ষাও।
নিকলীর মানুষ এখন কোনো বিশেষ প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় নেই। তারা চায় প্রশাসনের দরজা খোলা থাকুক, অভিযোগের প্রতিকার হোক, সরকারি সেবা পেতে পরিচয়ের প্রয়োজন না হোক এবং আইন প্রয়োগে দেখা হোক না কে প্রভাবশালী, কে সাধারণ। তাই শামীম আরাকে ঘিরে নিকলীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ‘তিনি নারী ইউএনও কি না’—এটি নয়। বরং আসল প্রশ্ন হলো, তাঁর নেতৃত্বে নিকলী কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রভাবমুক্ত প্রশাসন পাবে।
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনগুলোতে লিখবে নিকলীর নতুন প্রশাসনিক অধ্যায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..