1. nskibria2012@gmail.com : ns kibria : ns kibria
শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৫৬ অপরাহ্ন

সুন্দরবনে হরিণ শিকারের মহোৎসব: ৪৫ কেজি মাংসসহ আটক ২ পাচারকারী ‎

প্রতিনিধির নাম
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার পঠিত
১১

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাটঃ

‎সুন্দরবনের দাকোপ এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ৪৫ কেজি হরিণের মাংসসহ দুই পাচারকারীকে আটক করেছে কোস্ট গার্ড, যা বন্যপ্রাণী নিধন রোধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের জানান দিচ্ছে।..

‎সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে কোস্ট গার্ড। গত রাতে দাকোপ উপজেলার নলিয়ান বাজার ও দোয়ানিরগেট এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে কোস্ট গার্ড আউটপোস্ট নলিয়ানের একটি চৌকস দল। এই অভিযানে ৪৫ কেজি হরিণের মাংসসহ দুই পাচারকারীকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে, যাদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত মাংসের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৯৯ হাজার টাকা। কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এই অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। মূলত বনের গভীরে হরিণ শিকারের পর পাচারের উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ চক্রটি যখন নলিয়ান এলাকায় অবস্থান করছিল, তখনই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাদের ঘিরে ফেলে এবং দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। ঘটনাটি সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা, কারণ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে অস্ত্র ও ফাঁদ পেতে এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এখন জননিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‎আটককৃত পাচারকারীদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও জব্দকৃত মাংসের পরিমাণ থেকে স্পষ্ট যে, সুন্দরবনে হরিণ শিকারের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, বনের ভেতরের অভয়ারণ্যগুলোতে নিয়মিত টহলের অভাব এবং অসাধু শিকারিদের সাথে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ এই ধরনের অপরাধকে বারবার উসকে দিচ্ছে। উদ্ধার হওয়া ৪৫ কেজি মাংস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে বনের সংরক্ষিত প্রাণীদের নির্বিচারে নিধন করে বাজারে চড়া দামে বিক্রির একটি অশুভ বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাতের আঁধারে বনের ভেতর থেকে হরিণ শিকার করে তা নদীপথে পাচার করা হয়, যা দীর্ঘকাল ধরে সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও আটককৃতদের পরিচয় ও তাদের সহযোগীদের বিষয়ে তদন্ত চলছে, তবুও এই ঘটনাটি সুন্দরবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পাচারকারীদের বেপরোয়া মনোভাবকেই জনসমক্ষে উন্মোচিত করেছে।

‎ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপে কোস্ট গার্ড সদস্যরা জব্দকৃত মাংস এবং আটককৃত পাচারকারীদের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নলিয়ান ফরেস্ট অফিসের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে শিকার ও মাংস পাচারের দায়ে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি উঠেছে সচেতন মহল থেকে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আটককৃতদের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী নিধন ও পাচার সংক্রান্ত আইনে মামলা দায়ের করা হবে এবং তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হবে। তবে কেবল আটক বা মামলা দিয়েই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগের মধ্যকার সমন্বয় আরও নিবিড় করা প্রয়োজন এবং বনের প্রবেশপথগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানো জরুরি। কর্তৃপক্ষের এমন কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকলে পাচারকারীরা কিছুটা হলেও কোণঠাসা হবে বলে আশা করা যাচ্ছে, তবে বনের ভেতরের সুরক্ষাবলয় আরও শক্তিশালী করা না গেলে এই অপরাধ থামানো কঠিন হবে।

‎সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতে আরও বেগবান করার অঙ্গীকার করেছে কোস্ট গার্ড। এই ঘটনার প্রভাব সুদূরপ্রসারী, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দরবনে চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা বনের হরিণ ও বাঘের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীদের অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও বনভিত্তিক জীবিকার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এই ধরনের অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যদি বন্যপ্রাণী পাচার রোধে প্রশাসনিক কঠোরতা বজায় না থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই কেবল অভিযান নয়, বরং বনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আধুনিক প্রযুক্তি ও স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে একটি টেকসই সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি, যা সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অক্ষত রাখতে পারবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..