কানাইঘাট প্রতিনিধি:
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বীরদল আনোয়ারুল উলূম মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও টানা ৫৫ বছর মুহতামিমের দায়িত্ব পালনকারী প্রবীণ আলেম হযরত মাওলানা গোলাম ওয়াহিদ (হাফিযাহুল্লাহ)-কে নাগরিক সংবর্ধনা ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে সম্মানিত করা হয়েছে।
দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকে শিক্ষা বিস্তার, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও দ্বীনি খেদমতে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে আল-ওয়াহিদ আবনা ফুযালা ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
এসময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন— শাইখুল হাদিস হযরত মাওলানা শফিকুল হক সুরইঘাটী, সিলেটের বন্দরবাজার কেন্দ্রীয় মসজিদের খতীব হযরত মাওলানা মোশতাক আহমদ খান সাহেব, হযরত মাওলানা শামসুদ্দীন সাহেব দুর্লভপুরী, মুফতী মাসউদ আহমদ সাহেব (শাহবাগ জামিয়া), হযরত মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সাহেব, মাওলানা মুতাছিম আলী, বীরদল এন. এম. একাডেমির সাবেক প্রধান শিক্ষক মাস্টার জারুল্লাহ সাহেব, বর্তমান প্রধান শিক্ষক মাহবুবুল করীম, মাস্টার মামুনুর রশিদ, মাওলানা আজমত উল্লাহ (মুহতামিম, আকুনী মাদরাসা), মাওলানা জামিল আহমদ, ছোহবজাদায়ে বায়মপুরী র: , শেখ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া , জনাব, মনির আহমদ সাহেব,বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ মামুন, , হাফিজ জালাল সাহেব, সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হুসাইন চতুলী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা মাওলানা গোলাম ওয়াহিদের দীর্ঘ ৫৫ বছরের কর্মময় জীবন, দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান এবং বীরদল আনোয়ারুল উলূম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তাঁর ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে টানা ৫৫ বছর মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করা নিঃসন্দেহে একটি বিরল ও অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর নিষ্ঠা, আমানতদারি, প্রজ্ঞা ও আত্মত্যাগের কারণে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় ধরে দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
১৯৭০ সালে মাওলানা গোলাম ওয়াহিদের দূরদর্শী নেতৃত্ব, উদ্যোগ ও অক্লান্ত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় বীরদল আনোয়ারুল উলূম মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠানটির মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থেকে তিনি শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনাই করেননি, বরং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর স্নেহময় তত্ত্বাবধান ও আদর্শে গড়ে উঠেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে কর্মরত অনেক আলেম, ইমাম, খতিব, শিক্ষক ও দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত ব্যক্তির শিক্ষাজীবনের সঙ্গে বীরদল আনোয়ারুল উলূম মাদ্রাসার নাম জড়িয়ে রয়েছে। তাঁদের অনেকেই মাওলানা গোলাম ওয়াহিদের ছাত্র হিসেবে তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা পেয়েছেন।
মাওলানা গোলাম ওয়াহিদের দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা। একটি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালনা করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও তিনি দায়িত্ব থেকে পিছপা হননি।তাঁর নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধানে বীরদল আনোয়ারুল উলূম মাদ্রাসা ধীরে ধীরে এলাকার মানুষের কাছে একটি সুপরিচিত ও আস্থাভাজন দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, মাদ্রাসাটির সঙ্গে মাওলানা গোলাম ওয়াহিদের সম্পর্ক শুধু একজন মুহতামিমের দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ এবং দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারের প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর দীর্ঘ শ্রম ও আত্মত্যাগের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।
নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মাওলানা গোলাম ওয়াহিদের হাতে সম্মাননা হিসেবে নগদ ৪ লাখ টাকা তাহার তুলে দেওয়া হয়।
এ সময় উপস্থিত প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিনের শিক্ষক ও অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানাতে এ উদ্যোগ নেওয়ায় উপস্থিত অনেকে আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মাওলানা গোলাম ওয়াহিদের প্রতি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারও বহিঃপ্রকাশ ঘটে এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিদেশে অবস্থানরত তাঁর বহু ছাত্র এ সংবর্ধনা আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন।
দীর্ঘদিন আগে মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও তাঁদের অনেকের সঙ্গে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক এখনও অটুট রয়েছে। সেই সম্পর্কের জায়গা থেকেই প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের উস্তাদ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতার প্রতি সম্মান জানাতে এ আয়োজনে অংশ নেন।
একজন মানুষের কর্মজীবনের ৫৫ বছর একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থাকা এবং একই প্রতিষ্ঠানের মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত দীর্ঘ সময়ের বিষয়। বীরদল আনোয়ারুল উলূম মাদ্রাসার ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ সময়ের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে মাওলানা গোলাম ওয়াহিদের নাম জড়িয়ে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠার সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁকে মাদ্রাসার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে।
নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তারা তাঁর এই দীর্ঘ কর্মজীবনকে মূল্যায়ন করে বলেন, দ্বীনি শিক্ষার প্রসার ও নৈতিক সমাজ গঠনে তাঁর অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নাগরিক সংবর্ধনা ও আলোচনা শেষে মাওলানা গোলাম ওয়াহিদের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু এবং অব্যাহত দ্বীনি খেদমতের জন্য বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
দোয়া মাহফিলে মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আলেম-ওলামা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ উপস্থিত সবাই অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের জন্য আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান কামনা করা হয় এবং ভবিষ্যতেও যেন তিনি সুস্থতার সঙ্গে দ্বীনি শিক্ষা ও মানবকল্যাণে কাজ করে যেতে পারেন, সে জন্য দোয়া করা হয়।
মাওলানা গোলাম ওয়াহিদকে দেওয়া এ নাগরিক সংবর্ধনা কেবল একজন মুহতামিমকে সম্মান জানানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘ কর্মময় জীবন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস এবং দ্বীনি শিক্ষার প্রতি নিবেদিত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বীরদল আনোয়ারুল উলূম মাদ্রাসার সঙ্গে তাঁর যে দীর্ঘ পথচলা, তার ৫৫ বছর পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ আয়োজন তাঁর অবদানের একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন এলাকাবাসী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
একজন মুহতামিম হিসেবে দীর্ঘ ৫৫ বছর দায়িত্ব পালন শুধু সময়ের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্মৃতি, একটি প্রতিষ্ঠানের বিকাশ, প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষাজীবন এবং দ্বীনি শিক্ষার প্রতি একজন মানুষের নিরলস শ্রম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস।
বীরদল আনোয়ারুল উলূম মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মাওলানা গোলাম ওয়াহিদের অবদান এবং দীর্ঘদিনের মুহতামিম হিসেবে তাঁর কর্মময় জীবন কানাইঘাটের দ্বীনি শিক্ষা অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এ নাগরিক সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন ছাত্র, অভিভাবক, আলেম-ওলামা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়েছে, তা তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতি মানুষের গভীর কৃতজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ