নিজস্ব প্রতিবেদক ;
করোনার কারণে ঋণ পরিশোধে ছাড় অব্যাহত ছিল ২০২১ সালেও ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা
মহামরি করোনার কারণে ঋণ পরিশোধে ছাড় অব্যাহত ছিল ২০২১ সালেও। তার পরও খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যায়নি। পুরো বছরের চিত্র পাওয়া না গেলেও ৯ মাসের হিসাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ফের এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ)। খেলাপি ঋণের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলে সংস্থাটি। বছরজুড়েই বেসরকারি খাতে ঋণে ছিল ধীরগতি।
এ ছাড়া প্রবাস আয়ের পতন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, নয়-ছয় সুদ নিয়ে ছিল অস্বস্তি। এ ছাড়া কয়েক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, নানা অজুহাতে কর্মী ছাঁটাই, ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসসহ নানা চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাক্ষী হয় ২০২১ সাল।
করোনার কারণে ২০২০ সালজুড়েই ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধা পান ব্যবসায়ীরা। ফলে ওই সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেও কেউ খেলাপি হননি। ২০২১ সালে এই বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা না হলেও ঋণ পরিশোধে ছাড় অব্যাহত রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদ্যমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কিস্তির ২৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হলে ওই ঋণ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি করা যাবে না। এর পরও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণ স্থিতি ছিল ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয় এক লাখ এক হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৮.১২ শতাংশ। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা বা ৭.৬৬ শতাংশ। এর মানে চলতি বছরের ৯ মাসের হিসাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা।
প্রবাস আয়ে প্রথম ভাগে স্বস্তি, শেষ ভাগে অস্বস্তি
২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাস আয় পাঠালে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরেও এই সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে, কিন্তু এখন করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে। গত মে থেকে টানা কমছে অর্থনীতির অন্যতম এই সূচকটি। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে দেশে প্রবাস আয় এসেছে মাত্র ১৫৫ কোটি ডলার, যা গত ১৮ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে সোয়া ২৫ শতাংশ এবং আগের মাসের চেয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ কম।
অস্থির ছিল ডলারের বাজার
মহামারি করোনার মধ্যে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একই জায়গায় ‘স্থির ছিল ডলারের দাম। তবে করোনা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার পর বছরের মাঝামাঝি থেকে প্রবাস আয়ের টানা পতনের মধ্যে আমদানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাজারে ডলারের সংকট তৈরি হয়। ফলে আগস্ট থেকে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করে। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকা প্রায় এক টাকা দর হারায়। গত ১৪ নভেম্বর আন্ত ব্যাংকে ডলারের দাম ওঠে ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা। আর খোলাবাজারে দাম ওঠে প্রায় ৯১ টাকা। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে বাজারে ডলার বিক্রি বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত আগস্ট থেকে নভেম্বর এই চার মাসে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করা হয় প্রায় ২০৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৭ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা।
বেসরকারি ঋণে ধীরগতি
বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি ঋণে মন্থর গতি চলছে। মহামারি করোনার ধাক্কায় বছরের মাঝামাঝিতে তা একেবারে তলানিতে নেমে যায়। মে মাসে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় মাত্র ৭.৫৫ শতাংশ, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। তবে করোনা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ায় জুলাই থেকে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে গতি আসতে শুরু করে, তবে তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে কম। গত জুন মাসে এই খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় ৮.৩৫ শতাংশ। জুলাইয়ে তা ৮.৩৮ শতাংশ, আগস্টে ৮.৪২ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৮.৭৭ শতাংশ ও অক্টোবরে তা ৯.৪৪ শতাংশে উঠেছে। নিয়মিত ঋণের পাশাপাশি প্রণোদনা ঋণের ওপর ভর করে এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
নয়-ছয় সুদ নিয়েও অস্বস্তি
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এই সুদে ব্যবসায়ীরা ঋণের আবেদন করার আগেই দেশে হানা দেয় মহামারি করোনাভাইরাস। ফলে অনেক ব্যাংকের ঋণের সুদ ৭-৮ শতাংশে নেমে আসে। ঋণের চাহিদা না থাকায় আমানতের মুনাফা (সুদ) কমিয়ে আমানতকারীদের নিরুৎসাহিত করতে থাকে ব্যাংকগুলোও। ২০২১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চিত্র ছিল প্রায় একই রকম। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় গত আগস্টে মেয়াদি আমানতের সর্বনিম্ন সুদহার নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিছু কিছু ব্যাংক আমানতের সুদ না বাড়িয়ে দ্রুত মুনাফা অর্জনের মানসিকতায় আন্ত ব্যাংক কলমানি থেকে অপেক্ষাকৃত কম সুদে তহবিল সংগ্রহ করে ব্যবসা করতে থাকে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতিতে বছরের শেষ ভাগে অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরি হওয়ায় আন্ত ব্যাংকে তৈরি হয় নগদ টাকার টান। কয়েকটি ব্যাংক তারল্য সংকটের মুখেও পড়ে। ফলে কলমানিসহ সব ধরনের সুদই আবার বাড়তে শুরু করে।
ব্যাংকের প্রশ্নফাঁস
বছরের শেষ সময়ে সরকারি পাঁচ ব্যাংকের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। গত ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির আওতায় এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে এক হাজার ৫১১টি পদের বিপরীতে অংশ নেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৪২৭ চাকরিপ্রত্যাশী। পরীক্ষার পরপরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। একাধিক প্রার্থী অভিযোগ করেন, পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১০০টি প্রশ্নের প্রিন্ট করা উত্তরপত্র ফেসবুকে পাওয়া গেছে। এমন অভিযোগ ওঠার পর পরীক্ষা বাতিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকার সিলেকশন কমিটি।
Leave a Reply