নিজস্ব প্রতিবেদক:
মেট্রো রেলের যাত্রীসেবার ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দিতে হবে। আগামী ১ জুলাই থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
চলতি বছরের এপ্রিলে মেট্রো রেলের যাত্রীসেবার ওপর আগামী ১ জুলাই ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায়ের সিদ্ধান্ত জানায় এনবিআর। পরে নানা বিতর্কের পর এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সংস্থাটি।
এখন ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া বা কমানোর বিষয়ে ভাবছে না তারা। দায়িত্বশীল সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
মেট্রো রেলের টিকিটের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হলে সেই অর্থ যাত্রীকেই বহন করতে হবে। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে মতিঝিল স্টেশনের ভাড়া ১০০ টাকা।
এ ছাড়া যেকোনো দূরত্বে সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। তবে এই ভাড়ার সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত করলে ২০ টাকার ভাড়া বেড়ে দাঁড়াবে ২৩ টাকা। এ ছাড়া শুরু থেকে শেষ স্টেশনে যাতায়াত করলে ১০০ টাকার বদলে খরচ করতে হবে ১১৫ টাকা।
মেট্রো রেলের যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মেট্রো রেলের ভাড়া এমনিতেই অনেক বেশি, তার ওপর ভ্যাট যুক্ত করে ভাড়া বাড়ালে তা জনস্বার্থবিরোধী হবে।
যানজটকে পুঁজি করে মেট্রো রেলের ভাড়া আরো বাড়ানো উচিত নয় বলে মত তাঁদের।
টিকিটের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হলে বাড়তি অর্থ পরিশোধ করা যাত্রীদের জন্য চাপ তৈরি করবে এবং এই ভ্যাট আরোপকে আত্মঘাতী বলে মনে করেন বেসরকারি সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
যুগ-যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘মেট্রো রেলের টিকিট বিক্রি করা টাকাও সরকারের রাজস্ব। এই মুহূর্তে রাজস্ব আদায় বাড়াতে ভ্যাট আরোপ করা একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এমনিতেই আমাদের মেট্রো রেলের ভাড়া দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।
শুধু সর্বোচ্চই নয়, প্রায় কয়েক গুণ বাড়তি, যা সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বেশি চাপ তৈরি করছে।’
এনবিআরের আইন অনুযায়ী, তাপানুকূল (এসি) ও নন-এসি রেলওয়ে সার্ভিসের ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট প্রযোজ্য রয়েছে। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ২৬ অনুযায়ী, যাত্রী পরিবহন সেবার ক্ষেত্রে তাপানুকূল ও প্রথম শ্রেণির নন-এসি রেলওয়ে সার্ভিসের সেবার ক্ষেত্রে অব্যাহতি প্রদান করা হয়নি। যেহেতু মেট্রো রেল সম্পূর্ণ তাপানুকূল নিয়ন্ত্রিত, বর্তমানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেলওয়ে সার্ভিসের ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূসক প্রযোজ্য রয়েছে।
এর আগে গত বছর এক প্রজ্ঞাপনে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেট্রো রেলের যাত্রীসেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি দিয়েছিল এনবিআর। প্রজ্ঞাপন জারির আগে মেট্রো রেলের যাত্রীসেবার বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে মূসক কেটে অবহিত করার জন্য ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কম্পানি লিমিটেডকে চিঠি দিয়েছিল কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা।
চিঠির জবাবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট জানায়, বিভিন্ন দেশে মেট্রো রেল সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে চলে। শুধু ভাড়ার টাকায় লাভজনকভাবে মেট্রো রেল পরিচালনা করা যায় না। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, সবার জন্য মেট্রো রেল এবং মেট্রো রেলের যাত্রীদের কোনো শ্রেণিবিন্যাস না থাকায় মেট্রো রেলের যাত্রীসেবার ওপর কোনো ধরনের মূসক প্রযোজ্য নয়।
পরে সরকারি সিদ্ধান্তে মেট্রো রেলে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। এখন সরে আসতে চাওয়ার পেছনে মেট্রো রেলের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায়ে গতি বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরেন এনবিআর কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরে ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা যুগ-যুগান্তরকে বলেন, মেট্রো রেল আংশিক রুটে যাতায়াত করার প্রেক্ষাপটে যাত্রীসংখ্যা কম ছিল। সে হিসেবে তাদের আয়ও কম ছিল। বর্তমানে রুট বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীর সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। যেহেতু তারা সক্ষমতা অর্জন করেছে, তাই ভ্যাট অব্যাহতি প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
এই খাতে ভ্যাট আরোপ করা হলে কী পরিমাণ রাজস্ব আদায় হবে—এমন কোনো পর্যালোচনা করা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, বছরে ৭২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে। ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই লাখ ৬০ হাজার যাত্রী মেট্রো রেলে যাতায়াত করে। এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ যাত্রীর সংখ্যা দুই লাখ ৭৫ হাজার।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনবিআরের সাবেক সদস্য আব্দুল মান্নান পাটোয়ারী যুগ-যুগান্তরকে বলেন, মেট্রো রেলের টিকিটের ওপর ভ্যাট আরোপ করলে সাধারণ যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়বে। কিন্তু এনবিআরকে যেহেতু বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, তা পূরণ করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই।
অব্যাহতির একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। যুগ-যুগান্তরকে তিনি বলেন, মেট্রো রেলের টিকিটের ওপর ভ্যাট আরোপ করলে স্বাভাবিকভাবে ভাড়া বাড়বে। বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি কমিয়ে নিতে আইএমএফের পক্ষ থেকে সরকারের ওপর একটা চাপ ছিল। অব্যাহতি দিলে তার একটা সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। সামগ্রিকভাবেই এনবিআরকে ভাবতে হবে, কোন কোন ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি চালু রাখছে, আবার কোন কোন জায়গায় ভ্যাট আরোপ করতে যাচ্ছে। সেটা যেন বৈষম্যমূলক না হয়। এনবিআরকে এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে
Leave a Reply