চট্টগ্রামপ্রতিনিধি:
দুই সপ্তাহ আগে পেঁয়াজ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেও ভারত থেকে তেমন পেয়াঁজ আমদানি হচ্ছে না চট্টগ্রামে। ফলে খাতুনগঞ্জে সরবরাহ কম থাকার অজুহাতে দফায় দফায় বাড়ছে পেঁয়াজের দাম।
শনিবার (১ জুন) সকালে এ তথ্য জানান খাতুনগঞ্জে হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস। তিনি বলেন, ভারত পেঁয়াজ রফতানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখায় অধিকাংশ আমদানিকারক পণ্যটি আনছেন না।
এতে দেশি পেঁয়াজের ওপর নির্ভর এখন বাজার। তাছাড়া শুল্ক ছাড়াই চোরাইপথে পেঁয়াজ আসছে ভারত থেকে। ফলে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন আমদানিকারকরা। পেঁয়াজ আমদানিকারকরা বলতে গেলে এখন অলস সময় পার করছেন।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ২৫টি স্থলবন্দর রয়েছে। এর মধ্যে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে অল্প পরিমাণে পেঁয়াজ ভারত থেকে আসছে। আমদানি খরচ বেশি থাকায় খাতুনগঞ্জে ভারতীয় পেঁয়াজের দামটা চড়া। অপরদিকে কৃষকরা দেশি পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই এর প্রভাব আমাদের এখানেও পড়ছে।
তিনি জানান, দুই সপ্তাহ আগেও খাতুনগঞ্জে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ আকারভেদে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় ও ভারতীয় পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ আকারভেদে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় এবং ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে আকারভেদে ৬৫ থেকে ৭২ টাকায়। যা খুচরা পর্যায়ে বিক্রয় হচ্ছে প্রতিকেজি ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়।
আমদানিকারকরা জানান, দেশের ২৫টি স্থলবন্দর দিয়ে অন্তত ২০০ আমদানিকারক পেঁয়াজ আমদানি করে থাকেন। কিন্তু ভারত পেঁয়াজ রফতানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ বহাল রেখেছে। ভারতের শুল্ক, বাংলাদেশে বর্ডার খরচ, পরিবহন খরচ এসব যোগ করলে প্রতিকেজি পেঁয়াজ আমদানিতে ৬০ টাকার ওপরে খরচ পড়বে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ হয়ে এসব পেঁয়াজের দাম খুচরা পর্যায়ে গিয়ে ৮০ টাকার ওপরে ঠেকবে। তাই পেঁয়াজ আমদানিতে অনাগ্রহ। ৪ জুনের পর শুল্ক হারের বিষয়ে কোনো একটা সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এর ওপর নির্ভর করবে পেঁয়াজ আমদানি সম্ভব হবে কি না।
আমদানিকারকদের হিসাব মতে, ভারতে বর্তমানে পেঁয়াজের কেজি ১৭ রুপি। বর্ডারে আনতে গাড়িভাড়া খরচ পড়ে আরও ৬ রুপি। এর সঙ্গে ৪০ শতাংশ ভারতের শুল্ক ১৯ রুপি যোগ করলে বর্ডার পর্যন্ত প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পড়ে ৪২ রুপি। যা বাংলা টাকায় প্রায় ৬০ টাকা (এক রুপি সমান ১ টাকা ৪২ পয়সা হিসাবে)। তার সঙ্গে বাংলাদেশে প্রতি কেজিতে ৫ টাকা গাড়ি ভাড়া যোগ করলে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ পৌঁছতে খরচ হয় ৬৫ টাকা।
হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক মোহাম্মদ মোবারক বলেন, সব স্থলবন্দর দিয়ে অন্তত ২০০ আমদানিকারক ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে থাকেন। ভারত পেঁয়াজ রফতানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ বহাল রেখেছে। তাই আমরা অধিকাংশ আমদানিকারক পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রেখেছি। ভারতে এখন নির্বাচন চলছে। আশা করছি আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে শুল্কের বিষয়ে প্রতিবেশী দেশটি থেকে একটা সিদ্ধান্ত আসবে। সামনে কোরবানির ঈদ। ভারত যদি শুল্ক কমায়, তবে ব্যবসায়ী থেকে ভোক্তা সবাই উপকৃত হবেন।
আরেক আমদানিকারক শহিদুল ইসলাম বলেন, ভারত পেঁয়াজ রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু ৪০ শতাংশ শুল্ক বহাল রেখেছে। এই খরচে পেঁয়াজ আনলে সেটা আমাদের ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। আমরাও বিপাকে পড়ব। তাছাড়া বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে শুল্ক ছাড়াই পেঁয়াজ আসছে ভারত থেকে। তাই আমরা অধিকাংশ ব্যবসায়ী আপাতত পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রেখেছি। তবে কেউ কেউ সীমিত পরিমাণে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আনছেন।
ব্যবসায়ীদের মতে, অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের সংকট ও দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ভারত। এরপর থেকে বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ছিল। চলতি বছরের ৪ মে পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় ভারত।
দেশটি পেঁয়াজ রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকেই আমদানিকারকরা পেঁয়াজ আমদানির জন্য আইপি নেওয়া এলসি খোলাসহ সব প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। কিন্তু ভারতে পেঁয়াজের ওপর রফতানি শুল্ক ৪০ ভাগ আরোপ থাকায় পেঁয়াজ আমদানিতে বেশি খরচ পড়ছে। রফতানি শুল্ক প্রত্যাহার বা কমালে পেঁয়াজ আমদানি বাড়বে, তখন দেশীয় বাজারে দাম কমে আসবে বলে জানিয়েছেন আমদানি সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম বাড়া নিয়ে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে- এমন খবর এলেই ব্যবসায়ীরা পণ্যটির দাম কমিয়ে দিচ্ছেন। কয়েকদিন পর আবার দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এটা ব্যবসায়ীদের স্বভাবজাত অভ্যাস হয়ে গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন ক্রেতারা।
জেসমিন সুলতানা পারু বলেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি না হলেও আমাদের দেশে পণ্যটির ভালো ফলন হয়েছে। আমরা বলব, ব্যবসায়ীরা সব সময় দাম বাড়ানোর অজুহাত খুঁজতে থাকেন। কোরবানি ঈদের সময় ঘনিয়ে আসছে। তাই নানা অজুহাতে এখন থেকেই দাম বাড়ানো হচ্ছে। প্রশাসন, ভোক্তা অধিকারসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত হবে এখন থেকেই কঠোরভাবে বাজার তদারকি করা। অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা।
Leave a Reply