বাবা’ কেবল একটি দিবস নয়, স্মআজ বাবা দিবস
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বটবৃক্ষ ‘রণ করার উপলক্ষ শিশুর জন্মের পর পৃথিবী তাকে প্রথম যে দুটি নিরাপদ আশ্রয় উপহার দেয়, তার একটি মা, অন্যটি বাবা। মায়ের ভালোবাসা নদীর মতো দৃশ্যমান, আর বাবার ভালোবাসা অনেকটা বটবৃক্ষের ছায়ার মতো– নীরব, বিস্তৃত এবং অবিচল। তিনি কম কথা বলেন, খুব কম দাবি করেন, খুব কমই নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করেন। অথচ পরিবারের প্রতিটি স্বপ্নের পেছনে, প্রতিটি অর্জনের ভেতরে এবং প্রতিটি নিরাপত্তার অনুভূতির আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন বাবা।
সন্তান যখন ছোট থাকে, বাবা তার হাত ধরে হাঁটতে শেখান। বড় হলে শেখান জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার উপায়। অনেক সময় সন্তান বাবার কঠোরতা দেখে বিরক্ত হয়, তাঁর নিষেধাজ্ঞাকে ভুল বোঝে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করে– বাবার প্রতিটি কঠোর বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল গভীর মমতা, নিষেধের পেছনে ছিল নিরাপত্তার উদ্বেগ।
সমাজে মায়ের ভালোবাসার গল্প যতটা উচ্চারিত হয়েছে, বাবার ত্যাগের গল্প ততটা আলোচনায় আসেনি। হয়তো এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীতে মা দিবস পালিত হলেও বাবাদের জন্য আলাদা কোনো স্বীকৃতির দিন ছিল না। সেই শূন্যতার কথা অনুভব করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের এক নারী– সনোরা স্মার্ট ডড।
ডডের জীবন ছিল ব্যতিক্রমী। ছয় ভাইবোনের পরিবারে মা হারানোর পর তাদের লালন-পালনের সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন বাবা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট। একদিকে ভরণপোষণ, অন্যদিকে সন্তানদের মানুষ করার সংগ্রাম। সবকিছু তিনি একাই সামলেছিলেন। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেওয়া সেই বাবাকে দেখে বড় হয়েছিলেন সনোরা। বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকেই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে– যে মানুষটি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সন্তানদের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন, তাঁর জন্যও কি একটি সম্মানসূচক দিন থাকা উচিত নয়?
মা দিবসের প্রতিষ্ঠাতা আনা জার্ভিসের উদ্যোগ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ডড বাবা দিবসের স্বীকৃতির জন্য কাজ শুরু করেন। কিন্তু তাঁর পথ ছিল বন্ধুর। শুরুতে গির্জাগুলো এই উদ্যোগে সাড়া দেয়নি। সমাজও বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। তবু তিনি থেমে যাননি। একের পর এক স্থানীয় গির্জা, সামাজিক সংগঠন ও কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি মানুষের কাছে বাবার অবদানের কথা তুলে ধরতে থাকেন।
অবশেষে তাঁর অধ্যবসায়ের ফল মেলে। ১৯১০ সালের ১৯ জুন প্রথমবারের মতো বাবা দিবস উদযাপন হয়। সেই দিনের আয়োজন ছিল ছোট, কিন্তু এর তাৎপর্য ছিল বিশাল। কারণ সেটি ছিল এমন এক মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সূচনা, যিনি পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ।
ক্রমে বাবা দিবস জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। মানুষ বুঝতে শেখে, ভালোবাসা শুধু প্রকাশের বিষয় নয়; দায়িত্ব পালনও ভালোবাসারই আরেকটি ভাষা। সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য যে মানুষটি নিজের প্রয়োজনগুলোকে পেছনে সরিয়ে রাখেন, তাঁর অবদানও উদযাপনের দাবিদার।
এই উপলব্ধির ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন জুন মাসের তৃতীয় রোববারকে বাবা দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানিয়ে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। পরে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন একটি আইনে স্বাক্ষরের মাধ্যমে দিবসটিকে জাতীয় স্বীকৃতি দেন।
জুন মাসের তৃতীয় রোববার পৃথিবীর বহু দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। কিন্তু একটি দিন দিয়ে কি সত্যিই একজন বাবার অবদান মাপা সম্ভব? যে মানুষটি নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো সন্তানের চোখে পূরণ হতে দেখেন, যিনি পরিবারের সবার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নিজের চাহিদাকে নীরবে বিসর্জন দেন, যিনি ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরেও পরিবারের সামনে হাসিমুখে দাঁড়ান– তাঁর ত্যাগের পরিমাপ কোনো দিবসের ক্যালেন্ডারে ধরা যায় না।
বাবা আসলে সেই বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় দাঁড়িয়ে মানুষ রোদকে ভুলে যায়। কিন্তু ছায়ার মূল্য সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় তখনই, যখন সেই বটবৃক্ষ আর পাশে থাকে না। জীবনের নানা ব্যস্ততায় অনেক সময় বাবাকে বলা হয় না–‘তোমাকে ভালোবাসি’, ‘তোমার জন্যই আজ আমি এখানে’। অথচ তাঁর নীরব উপস্থিতিই আমাদের সাহস, নিরাপত্তা এবং আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় উৎস।
বাবা দিবস তাই কেবল একটি দিবস নয়, এটি স্মরণ করার উপলক্ষ। জীবনের সেই অনুচ্চারিত নায়কদের স্মরণ, যারা ভালোবাসাকে শব্দে নয়, দায়িত্বে লিখে যান। যারা নিজেদের কথা না ভেবে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েন। যারা ঝড়ের মুখে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন।