1. nskibria2012@gmail.com : যুগ যুগান্তর : যুগ যুগান্তর kibria
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০০ অপরাহ্ন

পদ্মায় ভরা মৌসুমেও মিলছে না আশানুরূপ ইলিশ কমেছে অন্যান্য মাছও, বাড়ছে জেলেদের দুশ্চিন্তা

প্রতিনিধির নাম
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার পঠিত

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
ভরা মৌসুমেও মানিকগঞ্জের পদ্মা নদীতে আশানুরূপ ইলিশের দেখা মিলছে না। দিনের পর দিন জাল ফেলেও অনেক জেলেকে ফিরতে হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত মাছ ছাড়াই। এতে একদিকে কমেছে জেলেদের আয়, অন্যদিকে বেড়েছে নৌকা, জ্বালানি, জাল, বরফ ও শ্রমিকের খরচ। ইলিশের পাশাপাশি কমেছে অন্যান্য দেশি প্রজাতির মাছের প্রাপ্যতাও। ফলে মৌসুমের শেষ সময়ে এসে ইলিশের আশার বদলে জেলেদের জীবনে ভর করেছে দুশ্চিন্তা।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর, শিবালয় ও দৌলতপুর উপজেলার বহু মানুষের জীবন-জীবিকা পদ্মা ও যমুনা নদীনির্ভর। নদীর পাড়ে সারি সারি নৌকা, ঘাটে বাঁধা নৌকা আর শুকাতে দেওয়া জাল-ভরা মৌসুমে যেখানে জেলেদের ব্যস্ততায় মুখর থাকার কথা, সেখানে অনেক নৌকাই অলস পড়ে আছে। জেলেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে জাল ফেলেও ফিরছেন অল্প মাছ নিয়ে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ-এর তথ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ সংলগ্ন লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ এলাকায় ইলিশ আহরণ হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে ১ হাজার ১১৭ টনে দাঁড়ায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ১ হাজার ১২২ টন হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নেমে আসে প্রায় ১ হাজার ৯০ টনে। সবচেয়ে বড় পতন ঘটে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে; ওই বছর আহরণ নেমে আসে মাত্র ৬২২ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় পাঁচ বছরের ব্যবধানে ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন, যা প্রায় ৪৬ শতাংশ।
সম্প্রতি পদ্মার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ইলিশের আশায় জেলেরা দীর্ঘ সময় নদীতে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না। জেলেদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও একই সময়ে তুলনামূলক বড় আকারের ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম কিংবা ৫০০ গ্রামের ইলিশই বেশি মিলছে। কখনো ৯০০ গ্রাম বা এক কেজি ওজনের ইলিশ জালে উঠলেও সংখ্যায় তা খুবই কম।
হরিরামপুরের খালপাড় এলাকার জেলে মো. আক্কাস বলেন, ‘আগের মতো এখন আর নদীতে ইলিশ পাওয়া যায় না। মাছের আশায় অনেক বেশি সময় নদীতে থাকতে হয়। ছোট ইলিশ কিছু পাওয়া গেলেও জাল, নৌকা, তেল ও শ্রমিকের খরচ বাদ দিলে তেমন কিছু থাকে না। মাঝে মধ্যে বড় ইলিশ পাওয়া যায়, তবে সেটি খুবই কম।’
জেলেরা জানান, মাছ কম পাওয়ায় নৌকার জ্বালানি, বরফ, জাল ও শ্রমিকের খরচও ঠিকমতো উঠছে না। এর সঙ্গে রয়েছে ঋণের চাপ। নৌকা ও জাল কেনা কিংবা মেরামতের জন্য মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের টাকা শোধ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি নিয়মিত দিতে হচ্ছে এনজিওর কিস্তি। সামনে আবার ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় মৌসুম শেষের দিকে এসে তাদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে।
অন্য জেলার জেলে রাকিব বলেন, নদীর বিভিন্ন স্থানে চর ও বালু জমে নাব্যতা কমেছে। পাশাপাশি বালুবাহী ও পণ্যবাহী নৌযানের চলাচল বেড়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন তিনি।
জেলেদের দাবি, শুধু ইলিশ নয়, আগে নদীতে তুলনামূলক সহজে পাওয়া যেত এমন দেশি প্রজাতির মাছও এখন কমে গেছে। ফলে অনেক জেলে পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। অন্যদিকে মাছের সরবরাহ কম থাকায় বাজারে দামও তুলনামূলক বেশি, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ইলিশ কেনা কঠিন করে তুলছে।
মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম বলেন, গত পাঁচ অর্থবছরের তুলনায় জেলায় ইলিশের আহরণ কমেছে। নদীর নাব্যতা সংকট, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া ও দূষণসহ বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কারণে ইলিশের বিচরণ ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বড় ইলিশের চলাচল ও প্রজননের জন্য নদীতে পর্যাপ্ত গভীরতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সমুদ্রে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে গেলেও তার প্রভাব নদীতে পড়তে পারে।
ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। গত অর্থবছরে মানিকগঞ্জের ১২ হাজার ৭৮৬ জন জেলেকে প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে পরিচালিত হয়েছে ৫৫৭টি অভিযান ও ৯৮টি মোবাইল কোর্ট। এসব অভিযানে নিষিদ্ধ জাল জব্দের পাশাপাশি জরিমানা, মামলা ও কারাদণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে।
তবে জেলেদের প্রত্যাশা, শুধু অভিযান পরিচালনা নয়-নদীর নাব্যতা রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, মাছের অভয়াশ্রম সংরক্ষণ এবং অবৈধভাবে মাছ ধরা বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পদ্মা ও যমুনার ওপর নির্ভরশীল হাজারো জেলে পরিবারের জীবিকা রক্ষায় নদীতে মাছের প্রাপ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইলিশ উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..