নিজস্ব প্রতিবেদক:
বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে ঢাকাসহ পাঁচ জেলার অবৈধ ইটভাটা দুই সপ্তাহের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পরিবেশ অধিদপ্তরকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকার আশেপাশের বাকি চার জেলা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও গাজীপুর।
বায়ু দূষণ রোধ সংক্রান্ত পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রধানের প্রতিবেদন দেখে বিচারপতি কেএম কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর বেঞ্চ আজ সোমবার এ আদেশ দেন।
আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আমাতুল করীম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ রাজা। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ বি এম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার।
আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকার বায়ু দূষণ রোধে উচ্চ আদালতের রায়ের নির্দেশনা দুই সপ্তাহের মধ্যে বাস্তবায়ন করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। গত ৫ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এ আদেশে আদালত পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকার দুই সিটি করপোরশেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের এ নির্দেশ দেন। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রধানের পক্ষ থেকে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে তা দেখে আদালত উষ্মা প্রকাশ করেছেন। কারো প্রতিবেদনই গ্রহণ করেননি। কারণ ঢাকার বায়ু দূষণ রোধে তারা আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেনি। যে কারণে সব বিবাদিকে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে ফের প্রতিবেদন দিতে বলেছেন হাইকোর্ট।’
তিনি আরো বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দুই সপ্তাহের মধ্যে ঢাকাসহ আশেপাশের পাঁচ জেলার অবৈধ সব ইটভাটা অপসারণ করে প্রতিবেদন দিতে।’
ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর-প্রতিবেদন যুক্ত করে ২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিট করে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)। ওই আবেদনের শুনানি শেষে আদালত রুলসহ আদেশ দেন।
আদেশে বলা হয়, ঢাকা শহরে যারা বায়ু দূষণের কারণ সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সপ্তাহে দুই বার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে পরিবেশ অধিদপ্তরকে।
সেদিন আদালত আদেশে বলে দেন, রাজধানীর যেসব জায়গায় উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ চলছে, সেসব জায়গা ১৫ দিনের মধ্যে এমনভাবে ঘিরে ফেলতে হবে, যাতে শুকনো মৌসুমে ধুলো ছড়িয়ে বায়ু দূষণ বাড়তে না পারে। পাশাপাশি ‘ধুলোবালি প্রবণ’ এলাকাগুলোতে দিনে দুই বার করে পানি ছিটাতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে সিটি করপোরেশনকে।
ওই আদেশের পর ২০১৯ সালের নভেম্বরে এইচআরপিবির পক্ষ থেকে সম্পূরক আবেদন করে আবার পাঁচটি নির্দেশনা চাওয়া হয়। সে আবেদনের শুনানির পর ২৬ নভেম্বর আদালত ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকার বায়ু দূষণ কমাতে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের জন্য পরিবেশ সচিবের নেতৃত্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিআরটিএ ও ডেসকোর প্রতিনিধিকে কমিটিতে রাখতে বলা হয় এবং এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন আদালত। এছাড়া প্রয়োজনে অতিরিক্তি লোকবল নিয়োগ করে রাস্তা, ফুটপাথ, ফ্লাইওভার, ওয়াকওভারের যেসব জায়গায় ধুলাবালি, ময়লা বা বর্জ্য-আবর্জনা জমিয়ে রাখা হয় বা জমে থাকে, সেসব ধুলাবালি, ময়লা, বর্জ্য-আবর্জনা সাত দিনের মধ্যে সিটি করপোরেশনকে অপসারণ করতে বলা হয়।
তারই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে এইচআরপিবির আরেকটি সম্পূরক আবেদন করে। সে আবেদনে ১২ নির্দেশনা চাওয়া হলেও হাইকোর্ট ওই বছর ১৩ জানুয়ারি ৯টি নির্দেশনা দেন।
আদালতের ৯ নির্দেশনা
ঢাকা শহরে মাটি, বালি, বর্জ্য ও মালামাল ঢেকে পরিবহন করতে হবে। চারপাশ ঘিরে উন্নয়ন বা নির্মাণ কাজ করতে হবে। মাটি, বালি, সিমেন্ট, পাথরসহ নির্মাণ সামগ্রী ঢেকে রাখতে হবে। ঢাকার রাস্তায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সকাল-বিকাল পানি ছিটাতে হবে সিটি করপোরেশনকে। রাস্তা, কালভার্ট, কার্পেটিং, খোঁড়াখুঁড়ির কাজ আইন ও দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে। যেসব যানবাহন নির্ধারিত মাত্রার বেশি কালো ধোঁয়া ছড়ায় সেগুলো জব্দ করতে হবে। সড়ক পরিবহন আইনের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক যানবাহনের ‘ইকোনোমিক লাইফ’ নির্ধারণ করতে হবে। যেসব পরিবহনের ‘ইকোনোমিক লাইফের মেয়াদ পেরিয়ে গেছে, সেসব যানবাহন নিষিদ্ধ করতে হবে। ঢাকা ও তার আশেপাশের এলাকায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া টায়ার পোড়ানো বা ব্যাটারি রিসাইকেলিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শপিং মল, বাজার, দোকানের প্রতিদিনের বর্জ্য ব্যাগ ভরে নির্ধারিত জায়গায় রাখতে হবে এবং সেগুলো অপসারণে সিটি করপোরেশনকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
এর মধ্যে করোনাভাইরাসে বায়ু দূষণ মৃত্যু ঝুঁকি বাড়াতে পারে, গণমাধ্যমে এমন প্রতিবেদন দেখে ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর এইচআরপিবির পক্ষে আরেকটি সম্পূরক আবেদন করা হয়। সে আবেদনের শুনানির পর আরো কয়েক দফা নির্দেশনা দেন উচ্চ আদালত। চলতি শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে তা আবার আলোচনায় আসে। বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহর হয়ে ওঠে ঢাকা। তখন এইচআরপিবির আবেদনে গত ৩১ জানুয়ারি হাইকোর্ট বায়ুদূষণ রোধে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ জানতে চান বিবাদীদের কাছে। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের তা জানাতে বলা হয়। সে আদেশ অনুযায়ী গত ৫ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তর একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে বায়ু দূষণ রোধে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখাতে না পারায় পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে সেদিনও অসন্তোষ প্রকাশ করেন আদালত।
Leave a Reply