নিজস্ব প্রতিবেদক :
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল কমে যাওয়ার দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করার কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত ফল করতে না পারলে সেই দায় শিক্ষার্থীদের একার নয়, শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে সেই দায় নিজের কাঁধেও নিতে হবে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) মিলনায়তনে এডুকেশন রিফর্ম ইনস্টিটিউটের (ইআরআই) আয়োজনে ‘সমৃদ্ধ অর্থনীতির বিনির্মাণে শিক্ষা: দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক গতিশীলতা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী।
এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘গতকালকে এসএসসির রেজাল্ট বেরিয়েছে। এসএসসি, দাখিল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন রেজাল্ট বেরিয়েছে। এটাকে একেকজন একেক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে। রেজাল্ট ড্রপ করেছে, গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ড্রপ করেছে।’
পাসের হার কমে যাওয়ার বিষয়টিকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে নারাজ মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জোর করে কি ফেল করানো যায়? জোর করে কি পাস করানো যায়? আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছে, করবে। তারা অনেকেই ভালো করতে পারেনি। সেই দায়-দায়িত্ব কি আমি শুধু এই ছাত্রছাত্রীদের দেব? না, আমি নিজের কাঁধে নেব।’
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা জানতে হলে বাস্তব ও নির্ভুল তথ্য প্রয়োজন। কৃত্রিমভাবে ফল বাড়িয়ে দেখালে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থা ও শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা কখনোই জানা যাবে না।
তিনি বলেন, ‘আমাকে রিয়েল ডেটা জানতে হবে। তাদের স্ট্যান্ডার্ড জানতে হবে। জানতে হবে আমার ডিফেক্ট কোথায়। জানতে হবে আমি কোন জায়গায় অ্যাড্রেস করব।’
কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকলেও তা চান না জানিয়ে এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘আমি যদি শিক্ষকদের বলে দিতাম, পার্সেন্টেজ বাড়িয়ে দেন। বা আমি যদি বোর্ডকে বলতাম, এবার পপুলার হতে হবে, তাহলে বোর্ডরা কী করত? ইংরেজিতে তিন পয়েন্ট, অঙ্কে তিন পয়েন্ট-সিস্টেম অ্যানালাইসিসকে বলে দিত। সাথে সাথে অ্যাড হয়ে যেত। কেউ জানতই না।’
এ ধরনের ফল দিয়ে প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয় জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘তাহলে সত্যিকার অর্থে রেজাল্ট হয়ে যে আমি কী জানতাম? আমার স্টুডেন্ট কী করছে?’
শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলের পেছনে শিক্ষক সংকট, করোনার পর শিক্ষায় তৈরি হওয়া ঘাটতি এবং শ্রেণিকক্ষে যথাযথ শিক্ষা কার্যক্রম না হওয়ার বিষয়গুলোও তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। বলেন, সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায় থেকে কলেজ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।
এহছানুল হক মিলন জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক সংকট রয়েছে। ৩৮ হাজার স্কুলের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৮০০টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজেও প্রায় ৭ হাজার ৭০০ শিক্ষক সংকট রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি স্কুলগুলোতে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি করোনার পর শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা কার্যক্রমও যথাযথভাবে হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা উচিত নয় বলেও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের স্কুলগুলোতে শিক্ষক নেই। আমাদের দেশে টার্ম চলেছে। করোনার পরে পড়ালেখা ডিস্টার্ব হয়েছে। ক্লাসরুম এডুকেশনগুলো ঠিকমতো হয়নি।’
শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজে নেমেছি।
গত দুই দশকে শিক্ষা ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোয়নি জানিয়ে এহছানুল হক বলেন, ‘মনে হচ্ছে যেন, উই আর ড্রাইভিং আওয়ার কার লুকিং অ্যাট মাই কার ইন রিভার্স গিয়ার। এই ২০ বছরে আমরা রিভার্স গিয়ারে দিয়ে পেছনের দিকে চলে আসছি।’
এদিকে এসএসসি পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একটি পরীক্ষা খারাপ হওয়া কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের শেষ অধ্যায় নয়।
এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘যারা ভালো করতে পারেনি, আমি তাদের অভিভাবককে অনুরোধ করব, একটি পরীক্ষা খারাপ করাটাই কি তার জীবনের ব্যর্থতা? তাদের আদর দিন, ভালোবাসুন। বলুন যে, না, তোমরা আগামী পরীক্ষায় ভালো করবে।’
শুধু জিপিএ-৫ কে শিক্ষার্থীর সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘একটি ক্লাসে জিপিএ-৫ পেলেই তার জীবনের সর্বোচ্চ স্বর্ণশিখরে পৌঁছে গেল, আর জিপিএ প্লাস না পেলে হলো না। তাদের শিখন পদ্ধতি কী? কতটা শিখেছে? কতটা আমরা তাদেরকে শিখাতে পেরেছি? এগুলো কি ভাববার বিষয় নয়?’
শিক্ষামন্ত্রীর মতে, এবারের ফলাফল শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা বোঝার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এই বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতেই কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কোন জায়গায় সংস্কার প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।