মোঃ আব্দুল রহমান
সিএনজি স্টেশনে গ্যাস মিলছে না, অনেক স্টেশন বন্ধ রয়েছে/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ
দেশের একটি ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
এ অবস্থায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ অন্যান্য শ্রেণির গ্রাহকরা গ্যাস সংকটে পড়েছেন।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশনেও এর প্রভাব পড়েছে। অনেক স্টেশন বন্ধ। আবার যেসব স্টেশন চালু আছে, সেগুলোতে গ্যাস নিতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে অনেককে গ্যাস নিতে হচ্ছে।
বুধবার (২২ জুলাই) সরেজমিনে ঢাকার বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাসের জন্য অপেক্ষমাণ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। কোনো কোনো স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও গ্যাস না পেয়ে চালকদের ফিরে যেতে দেখা গেছে।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকায় চালকদের এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও দীর্ঘ লাইন থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে চালকদের দৈনিক আয়-রোজগারও কমে যাচ্ছে।
সিএনজি অটোরিকশাচালক জহির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, সকাল থেকে কয়েকটি স্টেশনে ঘুরেছি। কোথাও গ্যাস নেই, আবার কোথাও দীর্ঘ লাইন। এত সময় গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করলে গাড়ি চালানোর সময় থাকে না। আজ যদি গ্যাস না পাই, তাহলে গাড়ি চালাতে পারবো না। এতে দিনের রোজগারও কমে যাবে।
রায়েরবাজারে আরেক সিএনজি অটোরিকশাচালক চালক নাজিম বলেন, স্টেশনে এসে দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে অনেক গাড়ি। কখন গ্যাস পাবো, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রতিদিন গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতে হয়। গ্যাসের জন্য যদি দিনের বেশিরভাগ সময় চলে যায়, তাহলে ইনকাম কম হবে। সংসার চালাতে কষ্ট হবে৷
শাহবাগে সিএনজি অটোরিকশাচালক আমির উদ্দিন বলেন, সকাল থেকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে গ্যাস নিতে পারলাম না। যেটুকু গ্যাস ছিল তা-ও প্রায় শেষ। এখন উপায় না পেয়ে বাসায় ফিরে যেতে হবে। সারাদিনে মাত্র ২৫০ টাকা ইনকাম করছি। গ্যারেজে টাকা জমা দিতে হবে। আজ জমার টাকাও হবে না।
এদিকে, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ ঘাটতির কারণে উৎপাদন ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
বুধবার বিকেলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনসহ অন্য গ্রাহকদের ওপর পড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি স্টেশনগুলো প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস দিতে পারছে না। এতে কয়েকটি স্থানে গ্যাস সংগ্রহে দীর্ঘ সারি ও সাময়িক জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সেখানে জানানো হয়, এফএসআরইউয়ের কারিগরি সমস্যা দ্রুত নিরসন করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন। একই সঙ্গে সীমিত সরবরাহের সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জরুরি ও অগ্রাধিকার খাতগুলোতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে।
বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এফএসআরইউয়ের কারিগরি সমস্যা হলেও দেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতা পরিস্থিতির প্রভাব আরও তীব্র করেছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব না দেওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর কোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ এলাকায় ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি কূপ খননের একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের লক্ষ্যে অনশোর ও অফশোর মডেল পিএসসি আওতায় গ্যাস উৎপাদনের জন্য দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কার্যক্রমও চলছে। একই সঙ্গে কূপ খনন, অবকাঠামো নির্মাণ ও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার প্রক্রিয়া চলমান।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা বাড়াতে সরকার আরও কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—চতুর্থ এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান, মালয়েশিয়া থেকে আইওসিএল ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই, ভোলার গ্যাস স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য পাইপলাইনসহ বিভিন্ন পরিবহনব্যবস্থা পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার এবং জ্বালানি আমদানির উৎস ও সরবরাহ অবকাঠামো বহুমুখীকরণ।