1. nskibria2012@gmail.com : ns kibria : ns kibria
রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ন

ইউনূসের নিয়োগ কৃত রামেবির উপাচার্যের অঢেল সম্পদের মালিক, দুদকে লিখিত অভিযোগ

প্রতিনিধির নাম
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৪৪ বার পঠিত
৫১

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক জাওয়াদুল হক নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের মালিক। তিনি কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক। অন্য চিকিৎসকদের মতো তিনি চেম্বার করে রোগী দেখেননি।

তারপরও তিনি কিভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন, তা খতিয়ে দেখতে রোববার (১৭ মে) দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ হয়েছে।
দুদক সচিবকে অভিযোগটি দিয়েছেন রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ধোপাঘাটা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হান্নান। তিনি একজন ঠিকাদার।

দুদকের মহাপরিচালককেও (অনুসন্ধান) অভিযোগের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। দুদকে দেওয়া এই অভিযোগের অনুলিপি প্রতিবেদকের হাতেও এসেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ভিসি অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক প্রাইভেট প্র্যাকটিসবিহীন কমিউনিটি মেডিসিনের ডাক্তার। তার স্ত্রী একজন গৃহিণী। তিনি মোটা অংকের টাকা খরচ করে দুই ছেলেকে ডাক্তারি পড়িয়েছেন। তারপরও স্ত্রী এবং তার নামে রাজশাহী ও ঢাকায় রয়েছে অঢেল সম্পত্তি।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, রাজশাহীর উপশহর হাউজিং স্টেটের ৩ নম্বর সেক্টরের ২৪ নম্বর বাসায় পাঁচতলায় এ ও বি ফ্ল্যাট দুটি ডা. জাওয়াদুল হকের। রাজশাহীর চন্দ্রিমা আবাসিকের ৩ নম্বর রোডে ১১৮/৭ নম্বর ছয়তলা বাড়িটিও তার। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বাজে সিলিন্দা ও বারুইপাড়া মৌজায় ১৫ কাঠা জমি, রাজশাহীর বনলতা এলাকায় যৌথ মালিকানায় প্লট, ঢাকার মিরপুর-১৩-তে বিজয় র্যাকিন সিটির ৫ নম্বর ভবনেও একটি ফ্ল্যাট আছে তার। এছাড়া নামে-বেনামে আরও অঢেল সম্পদ করেছেন ভিসি জাওয়াদুল হক। অভিযোগে রামেবিতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, ভিসি হওয়ার পর থেকে অবৈধ নিয়োগ, টেন্ডার বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন ডা. জাওয়াদুল হক। এর ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি মানসম্মত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বিষয়ে তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

দুদকে অভিযোগকারী আব্দুল হান্নান তাবাসসুম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। তিনি বলেন, রামেবি নির্মাণ কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম চলছে। এজন্য দুদকে অভিযোগ দিয়েছি।

উল্লেখ্য, আওয়ামী সরকারের আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ডা. জাওয়াদুল হক। ওই সময় তিনি নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকেই ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপর থেকে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।

গত মার্চে প্রায় ৭৭৭ কোটি টাকার ছয়টি প্যাকেজের নির্মাণ কাজ দিতে জেনিট করপোরেশন নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৯ শতাংশ ঘুস চাওয়ার অভিযোগ ওঠে।

সম্প্রতি আনজা করপোরেশন লিমিটেড নামের আরও একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ করেছে।

গত ২২ এপ্রিল মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে দেওয়া এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মু. আনিসুজ্জামান বলেছেন, সম্প্রতি তিনি লিথো ও ওএমআর পেপার ক্রয়ের দরপত্রে অংশ নেন। তিনি ইজিপি থেকে জানতে পেরেছেন, প্রতিবার যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়; তাদেরই এবার সর্বোচ্চ দরে কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে অন্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করেছে। তিনি ঠিকাদার বিষয়টি পুনঃমূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তা না হলে বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ আকারে উপস্থাপন করতে বাধ্য হবেন বলেও রেজিস্ট্রারকে দেওয়া চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন।
সূত্র মতে, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্নীতির নেপথ্যের কারিগর বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরপরই ২০১৮ সালে তিনি অবৈধভাবে ডিন, একাই ৭টি গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলসহ ৬৯ পরিদর্শন কমিটির আহবায়ক হয়ে দুর্নীতির আতুর ঘরে পরিণত করেন বিশ্ববিদ্যায়টিকে। তখন থেকেই তার বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করে। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসারী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) পতাকাতলে গিয়ে নিজের অপকর্ম আড়াল করেন তিনি।

সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তিনি খোলস পাল্টিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ ভিসি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ভিসি পদে বসেই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ও সরকারি বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে ৯ম গ্রেডের সেকশন কর্মকর্তা নাজমুল হোসেনকে ৫ম গ্রেডের পিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ তিন পদে বসান। এরপর অনুগত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের রেজিস্ট্রার, কলেজ পরিদর্শক, পরিচালকসহ বিভিন্ন উচ্চ পদে বার বার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং ডিন পদে নিয়োগ দিয়ে দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন তিনি।

সূত্র মতে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির (৬/১০/২০২৫) বিভিন্ন পদের আবেদনে অতিরিক্ত ফি আদায় করে ফেরত দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ প্রার্থীদের দিয়ে নিয়োগের কাজ করানো, অবৈধ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কলেজ পরিদর্শক পদের অভিজ্ঞতা শিথিলসহ শুধুমাত্র চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শুরুতেই অনিয়ম করেন বর্তমান ভিসি।

সূত্র জানায়, টেন্ডার ছাড়াই রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের সহস্রাধিক গাছ বিক্রি, পুকুর ও ফসলের জমি লিজ, দোকান ভাড়াসহ কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ আত্মসাত করেছেন ভিসির সিন্ডিকেট। প্রজেক্টের সম্পদ লুটের পর ভিসি হাজার কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্য শুরু করেন। ৭৭৭ কোটি টাকার ৫টি অবকাঠামো নির্মাণের টেন্ডার পছন্দের ঠিকাদারকে দেওয়ার জন্য পিপিআর লঙ্ঘন করে ক্রয় পরামর্শক এবং ইতিপূর্বে টেন্ডার সংক্রান্ত দুদকের একাধিক মামলা চলমান থাকা রেয়াজাত হোসেন রিটুকে মূল্যায়ন (টেক) কমিটির সদস্য করেছেন ভিসি। এসব টেন্ডারের জন্য ভিসির বিরুদ্ধে ৯% ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন জনৈক ঠিকাদার।

এদিকে, ভিসির বিভিন্ন অীনয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ এবং তার অপসারণের দাবিতে ৪/০৩/২০২৬ তারিখে মানববন্ধন করেন সচেতন রাজশাহীবাসী। এরপর ১০/০৩/২০২৬ তারিখে জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন রাজশাহী জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন। বিভিন্ন উচ্চপদে অবৈধ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে বেতন ভাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা এবং ৬/১০/২০২৫ তারিখে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিলের জন্য ২৩/১১/২০২৫ তারিখে লিগাল নোটিশ প্রদান করেন চাকরী প্রার্থী আব্দুল মাজেদ। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন তার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এখনও তিনি অবৈধ নিয়োগ, টেন্ডার বাণিজসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

এই চিঠির ব্যাপারে রামেবি ভিসি অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, আনজা করপোরেশন ইজিপি সিস্টেমে অযোগ্য বিবেচিত হয়েছে। তাই তারা কাজ পায়নি। কাজ না পাওয়ার কারণে এমন অভিযোগ তুলেছে। সমস্ত নিয়ম-কানুন মেনেই খাতা কেনা হচ্ছে।

দুদকে হওয়া অভিযোগ প্রসঙ্গে ভিসি বলেন, অভিযোগকারী আব্দুল হান্নানকে আমি চিনি না। তিনি কেন অভিযোগ করেছেন, আদৌ অভিযোগ করেছেন কিনা সেটিও বলতে পারব না।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল বারী বলেন, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অনিয়মের বিষয়ে আমরা আগেই অভিযোগ পেয়েছি। সেগুলো অনুসন্ধানের অনুমতি চেয়ে কমিশনে পাঠানো হয়েছে; কিন্তু এখন কমিশন নেই। এ কারণে এখনও অনুমোদন হয়নি। নতুন অভিযোগ হলে সেটিও কমিশনে অনুমোদনের পর আমাদের কাছে আসবে। প্রধান কার্যালয় থেকে অনুমোদন হয়ে এলেই আমরা অনুসন্ধান শুরু করব।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..