বাগেরহাট প্রতিনিধি :
মোংলা বন্দরে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ঘোষণা দিয়ে আনা চারটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা, যার বাজারমূল্য প্রায় সাত কোটি টাকা। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটি নামমাত্র শুল্ক দিয়ে গাড়িগুলো খালাসের অপচেষ্ট..
মোংলা বন্দরে ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আমদানিকৃত চারটি বিলাসবহুল গাড়ির একটি বড় চালান শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গত ১৯ জুলাই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হলে এই জালিয়াতির বিষয়টি উন্মোচিত হয়। ঢাকার গেন্ডারিয়াভিত্তিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্রাউন অটো মোবাইল সার্ভিসেস জাপানের মাহি কার পোর্ট থেকে এই পণ্যগুলো আমদানি করে। বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৬৯০৪ অনুযায়ী, চালানটিতে ১৬৪টি প্যাকেজে ১৪ ধরনের পণ্যের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এগুলো সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশ নয়, বরং চারটি বিলাসবহুল গাড়িকে বড় বড় খণ্ডে কেটে কৌশলে আমদানি করা হয়েছে যাতে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, এই চালানটির ঘোষিত ইনভয়েস মূল্য মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার দেখানো হলেও এর প্রকৃত বাজারমূল্য ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকারও বেশি হতে পারে।
তদন্তকারী সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, গাড়িগুলোকে এমনভাবে কাটা হয়েছে যা পুনরায় সংযোজন করলে অবিকল গাড়ির মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য ফিরে পায়। বিআরটিএ এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, গাড়ির বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ, সংবেদক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ অটুট রয়েছে। অভিযুক্ত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা শুল্ক-কর পরিশোধের চেষ্টা করেছিল, যেখানে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি হিসেবে আমদানি করা হলে রাষ্ট্রের কোষাগারে কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব জমা হওয়ার কথা ছিল। এই ধরনের কারসাজি কেবল সরকারি রাজস্বের ক্ষতি করছে না, বরং আমদানির আইনি কাঠামোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মতে, এটি নিছক যন্ত্রাংশ আমদানির নামে আংশিক সংযোজিত অবস্থায় মোটরযান আমদানির একটি সুপরিকল্পিত জালিয়াতি, যা জিআরআই আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসটি ইন্টারন্যাশনালের ভূমিকা ও আমদানিকারকের এমন জালিয়াতির বিষয়ে কাস্টমস গোয়েন্দা অধিদপ্তর কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এনবিআর জানিয়েছে, জব্দকৃত গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডাব্লিউ ৬৫০ আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ এবং টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট। বর্তমানে কর্তৃপক্ষ গাড়িগুলোর প্রকৃত মূল্য, ইঞ্জিনের ক্ষমতা ও বয়স বিবেচনায় চূড়ান্ত শুল্ক-কর নির্ধারণের কাজ করছে। আইন অনুযায়ী, কোনো পণ্য খণ্ডিত অবস্থায় থাকলেও যদি তাতে মূল পণ্যের এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার বা অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে, তবে সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবেই গণ্য করতে হবে। এ কারণেই এই চালানটিকে সাধারণ যন্ত্রাংশ হিসেবে ছাড়পত্র না দিয়ে আমদানিকারকের বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকির মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনাটি দেশের বন্দরগুলোতে চলমান তদারকির দুর্বলতা এবং অসাধু আমদানিকারকদের অপতৎপরতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে কোটি কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির এই চেষ্টা পরিবহন খাতে আমদানিনীতি ও শুল্কায়নের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের জালিয়াতি রোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে বন্দরগুলোতে কায়িক পরীক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে অসাধু চক্রগুলো বারবার সরকারি রাজস্বের ক্ষতিসাধন করবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আমদানিনীতির জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।