ক্রীড়া ডেস্ক :
একসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে হাসাহাসির কোনো অন্ত ছিল না। ধারাবাহিক ফর্মহীনতার কারণে ক্ষুব্ধ ভক্তরা ব্যঙ্গ করে তাঁর নামের আগে জুড়ে দিয়েছিল ‘লর্ড’ তকমা। সেই চরম অবজ্ঞা, ট্রল আর সমালোচনার কাঁটা বিছানো পথ পেরিয়েই শান্ত আজ এক নতুন অধ্যায়ের স্রষ্টা। একসময়ের সেই ‘লর্ড শান্ত’ আজ দেশের টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক। ড্র করার চিরাচরিত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি দলকে শিখিয়েছেন জেতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে ‘লর্ড’ শব্দটা একসময় ব্যবহৃত হতো তীব্র কটাক্ষ হিসেবে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের কয়েক বছর চরম অফ-ফর্মে থাকা শান্ত যখন বারবার দলে সুযোগ পাচ্ছিলেন, তখন সমর্থকদের ক্ষোভ রূপ নিয়েছিল মিম আর ট্রলে। ‘লর্ড শান্ত’ নামটা তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অলিতে-গলিতে। যেকোনো সাধারণ খেলোয়াড় এমন মানসিক চাপে হয়তো হারিয়ে যেতেন। কিন্তু শান্তর ধাতটাই যে অন্যরকম! এই তীব্র সমালোচনা তাঁকে ভেঙে ফেলতে পারেনি, বরং পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় পরিণত করেছে। সমালোচনার জবাবটা তিনি মাইক্রোফোনের সামনে দেননি, দিয়েছেন বাইশ গজের ক্রিজে আর অধিনায়কের আর্মব্যান্ড হাতে নিয়ে। ব্যঙ্গের ‘লর্ড’ তকমাটাই আজ যেন তাঁর রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।
অধিনায়ক হিসেবে অন্তত দশটি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এমন তালিকায় শান্তর সাফল্যের হার এখন সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। বর্তমান সময় পর্যন্ত তাঁর অধীনে খেলা ২০টি টেস্টের মধ্যে বাংলাদেশ জিতেছে ৯টিতে, হেরেছে ১০টি আর ড্র করেছে মাত্র ১টিতে। তাঁর জয়ের হার এক কথায় ঈর্ষণীয় ৪৫ শতাংশ! যেখানে সাবেক অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের জয়ের হার ২০.৫৮ শতাংশ (৩৪ ম্যাচে) এবং সাকিব আল হাসানের ২১.০৫ শতাংশ (১৯ ম্যাচে)। মুশফিকের গড়া ৭ জয়ের পুরোনো রেকর্ড টপকে শান্ত এখন ৯ জয় নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছেন, যার মাঝে রয়েছে পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো পরাশক্তিকে হারানোর অভাবনীয় কীর্তি।
অধিনায়কত্বের ভার অনেক সময় ব্যাটারদের ফর্ম কেড়ে নেয়, কাঁধে চেপে বসে অদৃশ্য এক চাপ। কিন্তু শান্তর ক্ষেত্রে সমীকরণটা একদম বিপরীত। নেতৃত্ব তাঁর জন্য বোঝা নয়, বরং নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার বড় অনুপ্রেরণা হয়ে এসেছে। অধিনায়ক হওয়ার আগে (২০১৭ থেকে ২০২৩) তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল ২৯.৮৩। কিন্তু অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই গড় লাফিয়ে উঠেছে ৩৯.৪২-এ। এই সময়ে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে পাঁচটি দুর্দান্ত শতক। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, নেতৃত্ব পাওয়ার পর একবারের জন্যও শূন্য রানে সাজঘরে ফিরতে হয়নি তাঁকে। দায়িত্ব যেন তাঁর ব্যাটকে করে তুলেছে আরও ধারালো।
শান্তর এই অভাবনীয় সাফল্যের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে তাঁর নিখুঁত গেম-রিডিং এবং আক্রমণাত্মক ক্রিকেটীয় দর্শনে। অনেকটা অস্ট্রেলিয়ান ঘরানার আগ্রাসী মানসিকতা আগ্রাসী ঘরানার ছাপ দেখতে পান, যেখানে মাঠে নামার আগেই ড্রয়ের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা হয়। ডারউইন টেস্টে তাঁর নেওয়া একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্তই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। প্রথাগত চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে, প্রথম ইনিংসে তাইজুল ইসলামের আগে তিনি ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে দেন পেসার হাসান মাহমুদকে। প্রতিপক্ষের বোলিং, পিচের আচরণ এবং ব্যাটারদের অবস্থা বিবেচনা করে নেওয়া এই সাহসী জুয়া দারুণভাবে সফল হয়। মেহেদী হাসান মিরাজের সাথে হাসানের গড়া সেই কার্যকরী জুটিই মূলত বাংলাদেশকে ম্যাচে চালকের আসনে বসিয়েছিল।
আরো ভালো করে দেখলে শান্তর অধিনায়কত্ব শুধু ফিল্ড প্লেসিং বা বোলার পরিবর্তনের প্রথাগত ছকে বন্দি নয়। তিনি বোলারদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেন, উইকেট শিকারের জন্য আক্রমণাত্মক ফিল্ডিং সাজান এবং টেস্টের প্রতিটি সেশনকে জয়ের একেকটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন। একসময়ের ট্রলের শিকার ‘লর্ড’ আজ পরিসংখ্যান এবং মাঠের সাহসিকতা, উভয় মাপকাঠিতেই বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক।